“এক কচৌড়ি দো সমোসা,
ইন মর্দোঁ কা ক্যা ভরোসা।”
“এক সুট্টা দো চায়,
মর্দ জাত হায় হায়।”
“মেরে সির মে দর্দ হ্যায়,
ইসকা কারণ মর্দ হ্যায়।”
দিল্লির নারীসুরক্ষার আন্দোলনে উঠে আসা এইরকম বেশ কিছু স্লোগান ঘিরে অনেকের প্রবল আপত্তি। “সমস্ত পুরুষকে একসঙ্গে দোষ দেওয়া হচ্ছে কেন? লক্ষ্য কি একটু নির্দিষ্ট হতে পারত না?” মেয়েদের নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা ছাপিয়ে শুরু হয়ে গেছে তাদের প্রতিবাদের ভাষার চুলচেরা হিসাবনিকাশ। মেয়েদের শরীর, স্বাধীনতা আর জীবন তো বহুদিন ধরেই আহত হচ্ছে। সেগুলো বোধহয় এত দিনে অভ্যাস হয়ে গেছে। তাই স্লোগানে পুরুষের ‘ইগো’ আহত হচ্ছে কি না, সেটাও এখন খুব জরুরি প্রশ্ন। কিন্তু প্রতিবাদের ভাষা নিয়ে বিতর্কের নিচে প্রতিবাদের কারণটা চাপা পড়ে গেলে সুবিধা কার?
এই আন্দোলনের সাম্প্রতিক স্ফুলিঙ্গ দিল্লির আস্থা কুঞ্জ পার্কে এক কিশোরীর উপর সংঘটিত যৌন নির্যাতনের অভিযোগ। ২১ সেপ্টেম্বর, নিজের সতেরোতম জন্মদিনে, এক বন্ধুর সঙ্গে মন্দিরে পুজো দিয়ে পার্কের ভিতর দিয়ে যাচ্ছিল সে। পুলিশের বয়ান অনুযায়ী, তিন ব্যক্তি নিজেদের পুলিশ পরিচয় দিয়ে বন্দুক ও ছুরি দেখিয়ে তাদের ভয় দেখায়, বন্ধুটিকে মারধর করে আলাদা করে এবং মেয়েটিকে ধর্ষণ করে। তিন অভিযুক্তই পরে গ্রেফতার হয়েছে। মেয়েটি জেলের শনাক্তকরণ প্রক্রিয়ায় তাদের চিহ্নিতও করেছে। পুলিশের কাছে স্থানীয়দের বয়ানে উঠে এসেছে, অভিযুক্তরা পার্কে যুগলদের হেনস্থা করত বলে অভিযোগ ছিল এবং একজনকে ছুরি নিয়েও ঘুরতে দেখা গিয়েছিল। পার্কের কর্মী ও নিরাপত্তারক্ষীদের মৌখিকভাবে উদ্বেগ জানানো হয়েছিল বলেও রিপোর্টে উল্লেখ রয়েছে। অর্থাৎ ঘটনার আগে সতর্ক হওয়ার মতো কিছুই ছিল না, এমনও নয়।
এই ঘটনা কাছাকাছি লেডি শ্রীরাম কলেজের পড়ুয়াদের প্রতিদিনের নিরাপত্তাহীনতাকেও আরও তীব্র করে তোলে। পরদিন এক অভিযুক্তকে ধরতে গিয়ে কলেজের পিছনের গেটের কাছে পুলিশের সঙ্গে গুলিবিনিময় হয়। ফলে ২২ সেপ্টেম্বর দুপুর থেকে ক্লাস বন্ধ হয়, ২৩ সেপ্টেম্বর ক্লাস চলে অনলাইনে, এবং ২৪ সেপ্টেম্বর সরাসরি ক্লাস আবার শুরু হয়।
সুরক্ষার অধিকার পেতে হলে তবে কি আগে নিজেকে আক্রান্ত হতে হবে?
এর পর দিল্লির বিভিন্ন কলেজ ও নর্থ ক্যাম্পাসে আন্দোলন ছড়ায়। ছাত্রীরা প্রশ্ন তুলেছেন, অপরাধের প্রতিক্রিয়ায় তাঁদের চলাফেরা, ক্লাস, সন্ধ্যাবেলা বাইরে থাকা কেন সীমিত হবে? রাস্তার আলো নষ্ট থাকলে আলো সারানো হবে, না মেয়েদের অন্ধকার নামার আগে ঘরে ঢুকিয়ে দেওয়া হবে? পার্কে নিরাপত্তার ঘাটতি থাকলে নিরাপত্তা বাড়বে, না মেয়েদের যাতায়াত কমবে? অপরাধী বাইরে ঘুরবে, আর সম্ভাব্য আক্রান্তকে নিজের সময়, পথ ও জীবন বদলাতে হবে — এই ব্যবস্থাকে আর কতদিন ‘নারীসুরক্ষা’ বলা হবে?
মেয়েদের জন্য নির্দেশিকা তৈরির যদিও সুবিধা অনেক। অপরাধ ঠেকাতে পরিকাঠামো, তদন্ত, দায়িত্ব এবং জবাবদিহি দরকার। বরং মেয়েদের বলা যায়, “ওখানে যেয়ো না।” ব্যস, কাজ শেষ। অথচ ঘটনার পরে প্রকাশিত ডিডিএ-র অডিটে দেখা গেছে, তাদের ৭৩৬টি পার্কের মধ্যে ৫২০টিতে অতিরিক্ত আলোর প্রয়োজন; কার্যকর সিসিটিভি রয়েছে মাত্র ১৬টিতে। এই তথ্য আন্দোলনের পরে সামনে এসেছে। মেয়েরা যে অন্ধকার আর নিরাপত্তার ঘাটতির কথা বলছিলেন, তার বাস্তব ভিত্তি কতটা, সেটাই স্পষ্ট করে দিয়েছে।
২৮ সেপ্টেম্বর সুপ্রিম কোর্টও দিল্লি ও সংলগ্ন অঞ্চলের সাম্প্রতিক ধর্ষণের ঘটনাগুলি নিয়ে একটি সুয়ো মোটো কগনিজেন্স নেয়। আদালত জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে প্রশাসনিক ব্যর্থতার কথা বলে এবং ২০১২ সালের নির্ভয়া-কাণ্ডের সঙ্গে বেদনাদায়ক মিলের উল্লেখ করে। ভাবুন! এত বছর পরেও মেয়েদের সেই একই নিরাপত্তার প্রশ্ন নিয়ে রাস্তায় নামতে হচ্ছে! প্রতিশ্রুতির বয়স বাড়ছে, নিরাপত্তার নিশ্চয়তা বাড়ছে না।
এই পরিস্থিতিতেও আত্মপক্ষসমর্থনের পরিচিত বাক্যটি হাজির — ‘নট অল মেন।’ নিশ্চয়ই সব পুরুষ ধর্ষক নয়। কিন্তু যে যুগে ধর্মগুরুরাও ধর্ষণের অপরাধে জেল খাটছে, সে যুগে কোন পুরুষটি বিপজ্জনক, তা আগে থেকে চিনিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব কে নেবেন? মেয়েদের হাতে কি এমন কোনও নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা আছে, যা দেখে বোঝা যাবে কে সীমারেখা মানবে আর কে ভাঙবে? “আমি তো তেমন নই” বললে বক্তার নিজের অবস্থান জানা যায়। রাস্তায় বেরোনো মেয়েটির অনিশ্চয়তা তাতে দূর হয় না।
হ্যাঁ, পরিবার চালাতে কঠিন কাজ করেন অসংখ্য পুরুষ। তাঁদের শ্রমের মর্যাদা আছে। সেই মর্যাদা এবং মেয়েদের নিরাপত্তার দাবি একই সঙ্গে থাকতে পারে। একটিকে স্বীকার করতে অন্যটিকে চুপ করানোর কোনো যৌক্তিকতা নেই। কোনও সীমান্তরক্ষী যদি ধর্ষণ করে, তার দেশসেবা সেই অপরাধ মুছে দেবে না। কোনও পরিশ্রমী উপার্জনকারী যৌন নির্যাতন করলে তার সংসার চালানোর কৃতিত্ব আক্রান্তের ক্ষতির ক্ষতিপূরণ হয়ে যাবে না। অপরাধের দায় থেকে ছাড় পাওয়ার জন্য পেশা বা আত্মত্যাগের শংসাপত্র চলে না। নারীসুরক্ষার প্রশ্ন উঠলেই অন্য পুরুষদের অবদানের তালিকা পড়তে শুরু করলে আলোচনাটি সরে যায়। যে মেয়েটি আক্রান্ত হয়েছে, যে মেয়েরা নিরাপদে চলাফেরার অধিকার চাইছে, তাদের কথা পিছনে পড়ে থাকে। সামনে আসে পুরুষের ভাবমূর্তি রক্ষার তাগিদ।
যে পুরুষটি ‘নট অল মেন’ যুক্তি দিয়ে ক্ষুব্ধ হচ্ছেন, তাঁর বাড়ির কোনো মহিলা রাত দুটোয় বাইরে একা থাকলে কি সেই একই যুক্তিতে তিনি নিশ্চিন্তে ঘুমোতে পারবেন? যদি না পারেন, তবে মেয়েদের প্রতিবাদের ভাষায় উত্তেজিত হয়ে সঙ্গে সঙ্গে নিজের নির্দোষ হওয়ার সার্টিফিকেট নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ার বদলে বরং নিজেকে প্রশ্ন করা যাক — “মেয়েদের এই আকস্মিক লাভা উদ্গিরণের পেছনে ঠিক কত শতাব্দীর দাবিয়ে রাখা আগ্নেয়গিরি?” বন্ধুদের আড্ডায়, পরিবারে, কর্মক্ষেত্রে নারীর উপর অধিকার ফলানোর প্রবণতাকে চ্যালেঞ্জ করতে পারেন। প্রতিবাদের লক্ষ্য যে নিয়ন্ত্রণ, অবমাননা ও দায়মুক্তির মানসিকতা, তা বুঝতে নিজের লিঙ্গপরিচয় বিসর্জন দিতে হয় না।
আবার সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনও পুরুষ নারীর অধিকারের পক্ষে কথা বললে তাকেও অপমানের মুখে পড়তে হচ্ছে। ‘পিক মি’, ‘ওহ নেহি দেগি ভাই’ ‘টেস্টোস্টেরনের অভাব’ — এই ধরনের মন্তব্যে খুবই প্রচলিত কমেন্ট সেকশনে। ধরেই নেওয়া হয়, নারীর পাশে দাঁড়ানোর একমাত্র উদ্দেশ্য তাকে ‘ইমপ্রেস’ করে যৌন সুবিধা পাওয়ার গোপন আকাঙ্খা। একজন পুরুষ নিজের ন্যায়বোধ থেকেও নারীর স্বাধীনতাকে সমর্থন করতে পারে — সেটুকুও স্বীকার করতে আপত্তি! বিদ্রুপের মধ্যে আসলে কিন্তু লুকিয়ে দলছুটকে শাস্তি দেওয়ার মানসিকতা। একটা প্রচ্ছন্ন হুমকি — “তুমি মেয়েদের পাশে, মানে তুমি মেয়েদের দলে। এবার কিন্তু পুরুষদের দলে তোমার গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে।” কিন্তু ঠিক কাদের নিয়ে গঠিত এই নির্দিষ্ট পুরুষদের দল? যারা লিঙ্গসমতায় বিশ্বাসী নয়, বা যারা মহিলাদের ভোগ্যবস্তু মনে করে, তাদের নিয়েই কি?
পুরুষতন্ত্রের প্রথম সারির ধ্বজাধারী কিন্তু মহিলারাও হতে পারেন! ছোটবেলা থেকে যে নিয়মকে ‘ভদ্রতা’, ‘আব্রু’ আর ‘মেয়েদের ভালোর জন্য’ বলে শেখানো হয়, তা একসময় নিজের বিশ্বাস হয়ে ওঠে। বিহারের জামুইয়ের ঘটনাটা এই নিয়ন্ত্রণের চেহারা আরও স্পষ্ট করেছে। ১৯ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যাবেলা এক কিশোরী ও তার পুরুষ সঙ্গীকে ঘিরে ধরে হেনস্থা ও মারধর করা হয়; মেয়েটির শ্লীলতাহানি করা হয়। ঘটনার পর সংবাদমাধ্যমের সাক্ষাৎকারে কিছু স্থানীয় মহিলা উচ্চস্বরে প্রশ্ন তুললেন — “মেয়েটা ওই সময়ে একটা ছেলের সঙ্গে কী করছিল? ভদ্র মেয়ে হলে রাতের বেলা একা একটা ছেলের সাথে ঘুরতো?” নারীর নিরাপত্তার জবাবদিহি চাওয়ার বদলে মেয়েটির চরিত্রের বিচারসভা বসে গেল। এবং স্থানীয় মহিলাদের নৈতিক বিচারে মেয়েটিই দোষী সাব্যস্ত হল।
জন্মাবধি নিয়ম মেনে চলার তালিম এবং অমান্য করার জন্য ‘শাস্তি’ পেয়ে অনেক মহিলা অন্য মেয়েদেরও একই ছাঁচে বিচার করতে শেখেন। আবার ‘ঐ মেয়েটা নিয়ম মানেনি বলেই বিপদে পড়েছে’ বিশ্বাস করে নিলে নিজে নিরাপত্তাবোধের একটা বুদ্বুদের মধ্যে বাস করা যায় — “আমি তো সমাজের নিয়ম মানি, তাহলে আমার সঙ্গে খারাপ কিছু হবে না।” কিন্তু যে নিয়ম নিজেকে আজীবন স্বাধীনতা দেয় নি, এমনকি স্বাধীনতার মানেও বুঝতে দেয় নি, সেই নিয়ম অন্য মেয়ের উপর চাপিয়ে দিলেই তো আর তা ন্যায়সংগত হয়ে যায় না! ‘আমাদের সময়ে এসব করতাম না’ কোনও নির্যাতনের সাফাই হতে পারে না। তথাকথিত চরিত্র পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ার শাস্তি হিসেবে কোনো মেয়েকে যে যৌন নিপীড়ন করা যায় না — এই সহজ যুক্তিটা বোঝা ঠিক কতটা কঠিন? এখানেই শিক্ষার সুযোগ ও অধিকারের প্রশ্নটা মাথাচাড়া দেয়। শুধু সাক্ষরতা নয়, শিক্ষা।
শুরু হয়েছে দুর্গাপুজো ও নবরাত্রি। দেশের নানা প্রান্তে দেবীর আরাধনা হবে, নারীশক্তির জয়ধ্বনি উঠবে। মণ্ডপে দেবীর সামনে মাথা নোয়ানো যদি সংস্কৃতি হয়, তাহলে জীবন্ত মেয়েটির স্বাধীনতা মেনে নিতে এত আপত্তি কেন? দেবীর হাতে অস্ত্র মানানসই, মেয়েদের মুখে প্রতিবাদের ভাষা বেমানান? শক্তি দেবীপ্রতিমায় প্রকাশ পেলে পবিত্র, নারীর সিদ্ধান্তে প্রকাশ পেলে অবাধ্য?
পরিশেষে উল্লেখ করবো, দেবী কালীকে বলপূর্বক নিয়ন্ত্রণ করে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করার প্রয়োজনবোধ হয়নি মহাদেবের। শারীরিক শক্তিতে পরাভূত করে নয়, চরণতলে শায়িত হয়ে কালীর ধ্বংসাত্মক তাণ্ডব থামান তিনি। পৌরুষের এর চেয়ে বৃহত্তর নমুনা জগৎসংসারে আর কী আছে?
প্রকাশিত হলো — বাঙালি.নেটওয়ার্ক-এর ❛উদ্যোগ❜ ওয়েব ম্যাগাজিনের আশ্বিন ১৪৩৩ সংখ্যা। নানা স্বাদের লেখায় সাজানো এই শারদ আয়োজন। উৎসবের দিনগুলিতে নিজের মতো করে পড়ুন, প্রিয় লেখাগুলি অন্যদের সঙ্গে ভাগ করে নিন, আর মন্তব্যে জানান আপনার অভিজ্ঞতা।
চলুন, একসাথে পড়ি, ভাবি, আর Glocal বাংলার জন্য Vocal হই।