বাড়ির সামনে একটা অসহায় বিড়ালছানা পড়ে থাকতে দেখলে আপনি কী করবেন? সম্ভবত বাড়িতে নিয়ে আসবেন, খাবার দেবেন, একটা সুন্দর নামও দিয়ে ফেলবেন। বলিভিয়ার এক বাসিন্দাও মোটামুটি সেটাই করেছিলেন। তিনি ভাবেন নি, এক দশক পরে বিজ্ঞানের ইতিহাসে সেই ‘বিড়ালছানা’ই রোমাঞ্চকর একটা জায়গা করে নেবে।
২০২৬ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর বিজ্ঞানবিষয়ক জার্নাল ‘কারেন্ট বায়োলজি’-তে গবেষকেরা আনুষ্ঠানিকভাবে বর্ণনা করেছেন নতুন এক প্রজাতির বন্য বিড়াল — Leopardus tilcayo। স্থানীয় মানুষের কাছে অবশ্য প্রাণীটি বহুদিন ধরেই ‘টিলকায়ো’ নামে পরিচিত। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞানের স্বীকৃতি এল এতদিনে। আর এর মধ্য দিয়ে এক শতাব্দীরও বেশি সময় পর নতুন একটি জীবিত বন্য বিড়াল প্রজাতি পেল বিজ্ঞান (এর আগে সর্বশেষ যে বিড়াল প্রজাতিটি শনাক্ত করা হয়েছিল, সেটি ছিল উরুগুয়ের পাম্পাস বিড়াল, যা ১৯২৩ সালে আবিষ্কৃত হয়)।
ঠিক ওয়াইল্ডলাইফ অ্যাডভেঞ্চার গল্পের মতো শুনতে এই ঘটনার শুরু বলিভিয়ার ইয়ুঙ্গাস অঞ্চলে। আন্দিজ পর্বতমালার পূর্ব ঢালে বিস্তৃত এই অরণ্যে পাহাড় আর আমাজন অববাহিকার মিলন ঘটেছে মেঘে ঢাকা ঘন জঙ্গলের মধ্যে। সেখানকার একটি রাস্তার পাশে পাওয়া গিয়েছিল ছোট্ট বিড়ালছানাটিকে। স্থানীয় এক ব্যক্তি সেটিকে সাধারণ ঘরোয়া বিড়াল ভেবে বাড়িতে নিয়ে যান। প্রায় এক বছর তাঁর কাছেই ছিল প্রাণীটি। নুডলস আর ডিম-ভাত খেয়ে বড় হচ্ছিলো! কিন্তু যত সে বাড়তে লাগল, ততই বোঝা গেল — এই বিড়াল ঠিক বাড়ির সোফায় শুয়ে দুপুর কাটানোর জন্য তৈরি হয়নি। বেশ বুনো স্বভাব তার।
শেষ পর্যন্ত তাকে পৌঁছে দেওয়া হয় সেন্দা ভের্দে বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যে। সেখানেই প্রাণীটিকে দেখে বলিভিয়ার জীববিজ্ঞানী পাওলা নোগালেস-আসকারুন্জের সন্দেহ হয়। প্রথমে তিনিও ভেবেছিলেন এটি দক্ষিণ আমেরিকার পরিচিত টাইগার ক্যাট, Leopardus tigrinus-এরই কোনো সদস্য। কিন্তু কিছু একটা হিসাৱ মিলছিল না।
গবেষকেরা দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সংগৃহীত ৩৮টি টাইগার ক্যাটের জিনগত তথ্য বিশ্লেষণ করেন। এর মধ্যে ছিল জীবিত প্রাণীর নমুনার পাশাপাশি জাদুঘরে সংরক্ষিত নমুনাও। এতদিন যাদের একই বৃহৎ গোষ্ঠীর সদস্য বলে ভাবা হচ্ছিল, জিনগত বিশ্লেষণ দেখাল তাদের বিবর্তনের গল্প আসলে অনেক বেশি জটিল। গবেষণায় টাইগার ক্যাটের পাঁচটি পৃথক জিনগত শাখা শনাক্ত হয়।
আর বলিভিয়ার সেই ছোট্ট বিড়ালটি?
সে কোনো ঘনিষ্ঠ প্রজাতির আঞ্চলিক বৈচিত্র্য একেবারেই নয়। তার নিজস্ব একটি বিবর্তনীয় ইতিহাস রয়েছে। গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী টিলকায়োর বংশধারা অন্য টাইগার ক্যাটদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে স্বাধীনভাবে বিবর্তিত হতে শুরু করেছিল প্রায় ১৪ লক্ষ বছর আগে। অর্থাৎ যে প্রাণীটিকে দশ বছর আগেও একজন মানুষ রাস্তার ধারে পাওয়া সাধারণ বিড়ালছানা ভেবেছিলেন, তার স্বতন্ত্র বিবর্তনীয় ইতিহাসের বয়স প্রায় ১৪ লক্ষ বছর!
আকারেও টিলকায়ো বেশ চমকপ্রদ। শরীরের দৈর্ঘ্য প্রায় ৪৬ সেন্টিমিটার, ওজন মাত্র ১.৪ কিলোগ্রামের কাছাকাছি — অর্থাৎ অনেক সাধারণ পোষ্য বিড়ালের থেকেও ছোট। হালকা বাদামি গায়ের ওপর ছড়িয়ে রয়েছে গাঢ়, অনিয়মিত rosette (চাকা চাকা দাগ)। ঠিক যেন একটা মিনিয়েচার চিতাবাঘ।
তবে আকার ছোট বলে তাকে আবার নিরীহ পোষ্য ভেবে বসবেন না। এটি সম্পূর্ণ বন্য প্রাণী। তার জীবনযাপন সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা এখনও খুব সামান্যই জানেন। পাওয়া মলের নমুনায় ছোট রোডেন্টের অবশেষ মিলেছে, অর্থাৎ প্রাণীটি শিকারী। এবং ক্যামেরা ট্র্যাপের প্রাথমিক তথ্য থেকে ধারণা করা হচ্ছে, প্রাণীটি সম্ভবত রাতে বেশি সক্রিয়।
নতুন প্রজাতি আবিষ্কার মানে শুধু শ্রেণিবিন্যাসের বইয়ে আরও একটি লাতিন নাম যোগ করা নয়। কোনো প্রাণীকে পৃথক প্রজাতি হিসেবে চিহ্নিত না করা গেলে তার প্রকৃত সংখ্যা কত, তার আবাসস্থল কতটা বিস্তৃত, কিংবা সেটি কতটা বিপন্ন — এসব প্রশ্নের সঠিক উত্তরও পাওয়া কঠিন।
টিলকায়োর ক্ষেত্রে এখন ঠিক সেটাই সমস্যা। বনে তাদের সংখ্যা কত, কোন কোন অঞ্চলে তারা রয়েছে, বিভিন্ন গোষ্ঠী একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন কি না — এখনও তার পরিষ্কার হিসাব নেই। অথচ তাদের আবাস ইয়ুঙ্গাসের ক্লাউড ফরেস্ট ইতিমধ্যেই নানা চাপের মুখে। বন উজাড়, কৃষিজমির সম্প্রসারণ, আগুন এবং খনন এই অঞ্চলের বাস্তুতন্ত্রকে ক্রমশ বদলে দিচ্ছে। এই আবিষ্কারের মধ্যে তাই আনন্দের পাশাপাশি কিছু গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু অস্বস্তিকর প্রশ্নও লুকিয়ে রয়েছে। নতুন শ্রেণিবিন্যাসের ভিত্তিতে প্রাণীটির সংরক্ষণগত অবস্থাও এখন নতুন করে মূল্যায়নের প্রয়োজন।
আমরা প্রায়ই ভাবি পৃথিবীকে বোধহয় মোটামুটি চিনে ফেলেছি। উপগ্রহ দিয়ে সমুদ্র মাপছি, দূর মহাকাশে গ্রহ খুঁজছি, জিনের অক্ষর পর্যন্ত পড়ে ফেলছি। অথচ সেই পৃথিবীতেই একটি সম্পূর্ণ আলাদা বন্য বিড়াল লক্ষ লক্ষ বছর ধরে নিজের মতো বেঁচে ছিল — আর বিজ্ঞান তাকে চিনল ২০২৬ সালে।
তাই Leopardus tilcayo-র আবিষ্কার হয়তো শুধু নতুন একটি বিড়ালের গল্প নয়। এটি মনে করিয়ে দেয় — পৃথিবীর জীববৈচিত্র্যের তালিকা এখনও শেষ হয়নি। প্রকৃতি এখনও মাঝে মাঝে আমাদের দিকে তাকিয়ে ছোট্ট করে যেন বলে — "জানার কোনো শেষ নাই..."
তা বলে জানার চেষ্টা কিন্তু বৃথা নয়...
আপনার প্রতিক্রিয়াতেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
প্রতিক্রিয়া দেওয়ার নিয়ম
আপনি এই সংখ্যায় আপনার পছন্দের সব লেখাতেই প্রতিক্রিয়া জানাতে পারবেন। তবে একটি লেখায় সর্বোচ্চ ২টি ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেওয়া যাবে। একই লেখায় তৃতীয় প্রতিক্রিয়া নির্বাচন করলে, প্রথমে নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং নতুন প্রতিক্রিয়াটি গণ্য হবে। আপনার প্রতিটি প্রতিক্রিয়া লেখকদের অনুপ্রেরণা জোগায় এবং বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সৃজনশীলতার প্রতি আপনার সমর্থনকে তুলে ধরে।