নন্দদুলাল গ্রামে কোনো কাজ পাচ্ছিল না, সংসারে বড় অভাব। বউ মুখরা, ছেলেগুলো খিদেয় কাঁদে। গ্রামের চায়ের দোকানে বসে হা-হুতাশ করছে, তখন ওই গ্রামের সম্পর্কে দুলালকাকা চায়ের দোকানে এলেন। উনি শহরে কী একটা কাজ করেন। উনি বললেন, "গ্রাম ছেড়ে যদি শহরে যাস, আমি তোকে কাজ দেব। আমি একটা সংস্থায় সিকিউরিটির কাজ করি। আমি বললে তোর কাজ হয়ে যাবে।"
গ্রাম ছাড়তে বড় কষ্ট নন্দের। জন্ম থেকে গ্রামের বাইরে পা দেয়নি। কী করে বাধ্য হয়ে গেল এবং ডালহৌসি অঞ্চলের নির্দিষ্ট ক'টি পাড়ায় রাত্রে সিকিউরিটি গার্ডের চাকরি পায়, কারণ তখন ওখানে চুরির প্রচুর ঘটনা ঘটছিল।
শীতকাল। নন্দদুলাল একটা চাদর জড়িয়ে, মাথায় ছেঁড়া মাংকি টুপি পরে, হাতে জোরালো টর্চ ও লাঠি নিয়ে ঘুরছে। এখানের ঠান্ডা তাদের গ্রামের তুলনায় কিছুই নয়। তবে কুয়াশাটা ভালোই পড়েছে। নিঝুম রাস্তা।
ডালহৌসি অঞ্চলে সেন্ট জন চার্চের উত্তর-পূর্ব কোণে রয়েছে খ্রিস্টানদের একটি সমাধিক্ষেত্র। তার পাশ দিয়ে যাবার সময় ওই দিকে তাকাবো না ভেবেও তাকিয়ে ফেলে নন্দ। গ্রাম্য ভয়ভীতি নিয়ে গড়ে ওঠা নন্দ শ্মশান, কবরস্থান কোনোদিকে তাকায় না — বিশেষ করে রাত্রে। তবু যা হয়, নিষিদ্ধ বস্তুর দিকেই টান বেশি, তাকিয়েই ফেলে। সে কি এত রাতে ওটা কে? গটগট করে হেঁটে আসছে এক ব্যক্তি, হাতে কিছু একটা রয়েছে। নড়বার মতো শক্তি হারিয়ে ফেলেছে নন্দ।
এরকম অদ্ভুত পোশাক কেন লোকটার? তাদের গ্রামের যাত্রায়, পালাটার নাম মনে পড়ে না, এইরকম পোশাক পরেছিল লোকটা — সাহেব সেজেছিল, কেমন "ট-ট" দিয়ে কথা বলছিল। এর তো বিলকুল সেরকম পোশাক। এরকম পোশাক এখনো সাহেবরা পরে?
এরপর তার বিস্মিত চোখের সামনে, তার অবস্থান থেকে বিশ-ত্রিশ পা দূরে সাহেব এসে থামলেন একটি সমাধির সামনে। হাঁটু গেড়ে বসলেন। হ্যাঁ, হাতে তাঁর ফুলের স্তবক। কুয়াশায় বোঝার উপায় নেই, কী ফুল বা কী রংয়ের ফুল। সাহেব দু-হাত দিয়ে সমাধির ওপর ফুলের স্তবক রেখে মাথা নত করলেন। আবার মাথা তুলে কী সব যেন বলছেন মনে হল, নাও হতে পারে। তারপর দু’হাতে মুখ ঢেকে রইলেন।
এটুকু দেখলে নন্দ হয়তো অতটা অবিশ্বাস্য মনে করত না। হঠাৎই দেখল আরও দূরে যেন দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। বহু লোক ঢোল, করতাল বাজাচ্ছে। না, নন্দর কানে কোনো আওয়াজ আসছে না, সে যেন নির্বাক সিনেমার মতো দেখছে। ও কি? কী হচ্ছে এসব?
আলুথালু বেশ, আঁচল খুলে পরেছে, দেহ এলিয়ে পড়ছে এমন এক নারীকে একদল লোক টানতে টানতে প্রজ্জ্বলিত আগুনের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। নন্দর মনে হল এক ছুটে গিয়ে মেয়েটাকে উদ্ধার করে। হায়রে, খোদ কলকাতার বুকে এসব কী নারকীয় কাণ্ড? সাহেবটা কী করছে? যেতে পারছে না? ওর কাছেই তো এসব ঘটছে। নন্দ কী করে যায়, ওর পা তো মাটিতে গেঁথে গেছে।
না, না, সাহেবটা ভালো। একটা বড় ঘোড়ার পিঠে চেপে ছুটল। সাহেবের ঘোড়াটা কোথায় ছিল? দেখেনি তো আগে, কাছাকাছি ছিল হয়তো। এই অঞ্চলে ঘোড়া দেখেছে নন্দ। সাহেব তরোয়াল বের করে এলোপাথারি চালাতে লাগল। ভয়ে জনতা মেয়েটিকে ছেড়ে হুড়মুড় করে ছুট লাগাল। সাহেব দ্রুত অচেতন মেয়েটিকে ঘোড়ায় তুলে নিলেন। হঠাৎ সব আবার কেমন রাবার দিয়ে মুছে দিলে যেমন হালকা থেকে হালকা হতে থাকে, তেমনভাবে অদৃশ্য হয়ে গেল তার চোখের সামনে।
হঠাৎ তার পাশে একটা নিমগাছে কাকের পরিবারের কোনো কারণে ঘুম ভেঙে কা-কা করে ডেকে উঠল। সেই কর্কশ স্বরে নন্দর চেতনা ফিরল। কই, সমাধিক্ষেত্রে কেউ তো নেই। কুয়াশাটা আরেকটু যেন ঘন হয়েছে। চোখ বড় বড় করে ভালো করে দেখবার জন্য তাকাল নন্দ, না, কিছু ঠাহর হচ্ছে না। এবার তার খুব ভয় করতে লাগল। শীতে এমনিই ঠান্ডা লাগছিল, এবার ভয়ে হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেল। নড়তেই পারছে না। হাত থেকে টর্চ কখন পড়ে গেছে। ও নিজেও পড়ে গেল।
কুয়াশা কাটিয়ে রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল এক মাতাল। সে এসে ওকে ঝাঁকানি দিয়ে বলল, "কি রে, তুই ও খেয়েছিস নাকি? বাড়ি যা। খুব ঠান্ডা। আমিও বাড়ি যাচ্ছি, তবে রাস্তাটা খুঁজে পাচ্ছি না।" একটা জ্যান্ত মানুষের স্পর্শ ও কণ্ঠস্বর শুনে নন্দর হাতে পায়ে জোর এল, উঠে দাঁড়িয়ে দ্রুত হাঁটা দিল ওর আস্তানার দিকে। না, আজ আর ডিউটি দিতে অক্ষম সে।
পরদিন নন্দ ভাবে গ্রামেই ফিরে যাবে। গ্রামেও ভূত আছে, কিন্তু তারা তো গ্রামেরই — তার মতো সাধারণ মানুষ। এই অজানা জায়গায় ওই সব সাহেব ভূতের হাতে সে প্রাণ দিতে পারবে না। বাবা, ওরা খুব খতরনক হয়। আবার তার সাথে দেখা হলে তার গলাটাই যদি কেটে দেয় বা গুলি করে?
কিন্তু গ্রামে ফিরেই বা করবে কি? এক টুকরো জমিজায়গা নেই তার, কোনো কাজই নেই। সে বউকে এত বীর সেজে নিয়ে আসে ঘরে, অথচ তাকে খেতে, পরতে দেবার যোগ্যতা তার নেই। হ্যাঁ, তারই গ্রামের মেয়ে লীলা। লীলার সাথে ছোটো থেকেই খুব ভাব ছিল তার। দু’জন দু’জনকে ভালোবাসত। কিন্তু সে হতদরিদ্র, তাই লীলার অন্যত্র বিয়ে ঠিক হয়। পয়সার লোভে লীলার মামা-মামী এক ষাট বছরের বুড়োর সঙ্গে বিয়ে দিচ্ছিল। বিয়ের আগের দিন রাত্রে লীলাকে নিয়ে পালিয়ে গ্রামের মা কালীর মন্দিরে বিয়ে করে। ব্যাস, তারপর খাওয়াবে কি? টুকটাক কাজ করে, কিন্তু চলে না। অভাবে অভাবে লীলা মুখরা হয়ে গেছে। নাঃ, গ্রামে ফেরা যাবে না।
দুলাল কাকাকে বলে তাকে কোনো ফ্ল্যাট-বাড়ি বা অফিসে কাজ দিতে। কাকা রেগে যায়, কারণ কাজ এত সুলভ নয়, তবু চেষ্টা করবেন — এখন তো করুক এই কাজটা। নন্দদুলাল কাকে বোঝাবে তার সমস্যা। শেষে তারই বয়সী একটি ছেলে বিকাশকে বলল। সে তো হেসেই খুন। ওই জায়গায় ও তো পাঁচ বছর কাজ করেছে, কিছু তো দেখেনি। নন্দ কুয়াশায় কি দেখতে কি দেখেছে। সাহেব, আগুন, ঘোড়া — বাপ্রে বাপ। নন্দ কি সিনেমায় গেছিল? হ্যাঁ, বুঝেছে, অবেলায় বাসি খাবার খেয়ে ওর গ্যাস হয়েছিল। "তুই শালা একটা গেঁয়ো ভূত।"
এরপর থেকে নন্দ আর কাউকে বলেনি। তাকে "গাঁইয়া", "গেঁয়ো ভূত" বলে সবাই ঠাট্টা করবে। পেটের দায়ে নন্দ এখানকার কাজটা করে, তবে ওদিকটায় রাত বারোটার পর আর যায় না। লোক থাকতে থাকতে ঘুরে আসে। তবে তাকায় না, মাথা নিচু করে যায়।
মাস দুয়েক কেটে গেছে নন্দর। এক ছুটির দিনে চার্চে গেছে নন্দ। তখন ওখানকার এক দারোয়ানের সঙ্গে দু-একটা কথা হতে হতে জিজ্ঞেস করল, "আচ্ছা, ওখানে ওই কবরস্থানটা কার?" দারোয়ান বলে, "আরে জান না! এই যে কলকাতার বুকে তুমি দাঁড়িয়ে আছ, সেই কলকাতা যিনি গড়ে তোলেন — জব চার্নক। ওনার পাশে ওনার স্ত্রীর সমাধিও আছে। একদিন ঢুকে দেখে এস। সাহেবের স্ত্রী ছিল হিন্দু ব্রাহ্মণ ঘরের মেয়ে। উনি সতীদাহর আগুন থেকে বাঁচিয়ে বিয়ে করেন। সবাই এ গল্প জানে, তুমি জান না? যাও না, যাও দেখে এসো।"
নন্দ আর কথা বাড়ায় না। মরে গেলেও সে ওখানে যাবে না। এমনকি দিনেও নয়।
তবে নন্দ ভাবে, সত্যি কি সে এতকিছু সেখানে দেখেছিল? নাকি কল্পনা? কিন্তু এর গল্পের সাথে তার দেখাটা কেমন যেন মিলে যাচ্ছে। বড়োই ধোঁয়াশায় নন্দ।
লেখিকার জন্ম জন্ম কালনা শহরে৷ যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচ.ডি করে সোনারপুর মহাবিদ্যালয়ে অধ্যাপনায় রত৷ প্রবন্ধ, কথাসাহিত্য ও কবিতা লেখেন৷ 'প্রকাশিত হয়েছে 'নারী প্রগতির সেকাল ও একাল',' নারী প্রগতি নানা ভাবনায়', 'এক মলাটে তিন ভুবন', 'বাংলা কথাসাহিত্যে অস্তিত্ববাদের প্রভাব', 'রূপকথা ছড়া ও রহস্যের জগৎ', 'দেশে বিদেশে : এক স্বতন্ত্র পাঠ', 'জীবনস্মৃতি কিছু কথা কিছু ছবি', 'বৃন্দাবন দাস বিরচিত শ্রীচৈতন্য ভাগবত আদিখণ্ড', 'প্রথম প্রতিশ্রুতি এক নারীর লেখায় এক নারীর কথা' প্রভৃতি বই সহ অসংখ্য প্রবন্ধ৷ আসন্ন কলকাতা বইমেলায় 'মাটির টানে' নামক একটি উপন্যাস প্রকাশিত হবে৷
ভৌতিক গল্পের পরিবেশের মধ্যে সুন্দরভাবে ইতিহাসের একটি টুকরো এনেছেন লেখিকা, ভারী ভালো লাগলো। আপনার গল্প বলার কৌশলে গল্পটি পাঠ করা এক সুন্দর অভিজ্ঞতা হয়ে রইল। আগ্রহ আরো বেড়ে গেল। আপনি লিখতে থাকুন আমরা পড়তে থাকি।
অপূর্ব গল্প। এক ভৌতিক আবহের মধ্যে কোলকাতা শহরের অতীত, তৎকালীন সমাজ ও সমাজ সংস্কারের যে সংক্ষিপ্ত অথচ স্পষ্ট বর্ণনা তুলে ধরেছেন লেখক তা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। লেখকের থেকে এমন আরো ভাল লেখা আশা করব।
খুব সুন্দর হয়েছে ।
লেখাটা পড়লাম। ইতিহাস, কল্পনা, রোমাঞ্চের মিশেলে সংক্ষিপ্ত পরিসরে সুন্দর হয়েছে গল্পটি। পড়ে খুব ভালো লাগলো।
এত সংক্ষিপ্ত পরিসরে দারুণ লেখনী।
অসাধারণ হয়েছে ম্যাম গল্পটা। গল্পের প্রতিটা লাইনে নতুন নতুন চমক। গল্পের মধ্যে দিয়ে একটা সুন্দর ছবি ফুটে উঠলো যেনো চোখের সামনে।
অতিপ্রাকৃত আর ইতিহাস মিলেমিশে একাকার।খুব সুন্দর লিখেছেন।
ভালো গল্প, ভূতের গল্পের মোড়কে কলকাতা শহরের নির্মাতার ব্যাক্তিগত জীবনের একটা আভাস দেখা দিল।
বেশ অন্যরকম গল্প। ভালো লাগলো। চলতে থাকুক আপনার কলম…
খুব সুন্দর হয়েছে গল্পটা।
Golpoti atyanto akorshonio.darun,ek kathai!