Information

Contests

উদ্যোগ
Web Magazine


Glocal বাঙালি | Vocal বাঙালি
Glocal বাঙালি | Vocal বাঙালি
udyog logo 2026 bangali.network

ডিসক্লেইমার : এই লেখায় প্রকাশিত মতামত author / writer / interviewee-এর নিজস্ব এবং লেখাটি Bangali Network সংস্থার মতামত বা অবস্থান প্রতিফলিত না-ও করতে পারে। লেখক পরিচিতিতে প্রদত্ত তথ্য লেখক / লেখিকার নিজস্ব বিবরণ অনুযায়ী প্রকাশিত। Bangali Network তথ্যগুলির সত্যতা যাচাই করে না।

ডিসক্লেইমার : এই লেখায় প্রকাশিত মতামত author / writer / interviewee-এর নিজস্ব এবং লেখাটি Bangali Network সংস্থার মতামত বা অবস্থান প্রতিফলিত না-ও করতে পারে। লেখক পরিচিতিতে প্রদত্ত তথ্য লেখক / লেখিকার নিজস্ব বিবরণ অনুযায়ী প্রকাশিত। Bangali Network তথ্যগুলির সত্যতা যাচাই করে না।
চুল কাটতে গেল বেলা
"আমি টাকা দিতে পারব না জেনেও অণুকে কেবিনে রেখেছিলেন কেন? সুন্দরী মহিলা দেখলেই ভোগের আকাঙ্ক্ষা জাগে তাই না?" ডাক্তার বলে, "কেশব সীমা ছাড়িও না।" কেশব বলে, "মোক্ষলাভ না হওয়ায় অন্যভাবে মারলেন আমাদের।"
চুল কাটতে গেল বেলা

সেলুনের দেওয়ালের রঙ চটে গেছে বহুদিন। সারানোর পয়সা নেই কেশবের। পলেস্তারাও জায়গায় জায়গায় খসে পড়েছে। টিমটিম করে আলো জ্বলছে ঘরে। বেঞ্চে একা বসে কেশব কাগজ পড়ছে। কাগজ কেনার ক্ষমতা বহুদিন আগেই হারিয়েছে কেশব। পাশের সাইবার কাফে থেকে গতদিনের কাগজটা চেয়ে এনে দেখে। কেশবের সেলুনে সারাক্ষণ এফ এম রেডিও চলে। কেউ শুনুক না শুনুক রেডিও চলবে। আজ সেলুনে খরিদ্দার নেই। সংবাদপত্র দেখে আর পুরানো গান শুনে পাকস্থলীর খিদে মেটে না। সময় যেন কাটতেই চাইছে না। এমন সময় কৌশিক ডাক্তার এসে উপস্থিত সেলুনে। কৌশিক জিজ্ঞেস করে, "কী ব্যাপার হে? দোকান যে গড়ের মাঠ। ভীড় এড়াতে বেকার আমি ভর সন্ধ্যায় এলাম।" কেশব বলে, "স্যার বসুন। ভগবানের কাছে আমার জন্যে একটু দোয়া করুন, দোকানে খরিদ্দারের আকাল।" কৌশিক বলে, "কী যে পাগলের মত বল! চাইলে তো আমি নিজের জন্যই চাইতে পারি। চাইলেই যদি সব পাওয়া যেত। আমি কিন্তু তোমায় ভুলিনি।" কেশব ভাবতে থাকে, তুমি যা হাড় কৃপণ, বাজারে গিয়েও দরদস্তুর কর। ভাবের ঘোর ছেড়ে কেশব শুধায়, "আচ্ছা স্যার আপনার কি চাওয়ার আছে? মস্ত মস্ত দুটি গাড়ি প্রাসাদোপম বাড়ি। ছেলেরা বড় বড় চাকরি করে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা আনছে ঘরে।" কৌশিক ভুরু কুঁচকে বলে, "কী যে বল! কতশত চাওয়া না পাওয়া রয়ে গেল জীবনে। ডাক্তার মুখার্জী বলছেন এমন কথা! আমার বিশ্বাস হচ্ছে না।" কেশবের কথায় ডাক্তার বলে, "কেশব চাহিদার শেষ রাখতে নেই। চাহিদা মরে গেলে বাঁচার তাগিদ মরে যায়।" কেশব বলে, "ঠিক, যেমন আমার জীবন, যার একমাত্র চাহিদা হল খেয়ে পরে বেঁচে থাকা। আপনার চাওয়াগুলো কেমন যদি বলেন?" ডাক্তার বলে, "আমার সঙ্গে বকবক না করে কাজ শুরু কর।" মাথা চুলকিয়ে কেশব জিজ্ঞেস করে, "স্যার বৌদি ভালো আছেন?" সে আর বলতে, "ঐশ্বর্য আর ভালো থাকা সমার্থক বুঝলে কেশব।" কেশব চেয়ারের ওপরে একটা টাওয়েল রাখে।

ডাক্তার চেয়ারে আসীন হতে গিয়ে ফিরে আসে। কেশবের বাবার কেনা বেলজিয়াম আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বড় হওয়া চুলগুলো মেপে নেয় ডাক্তার। তার চোখ চলে যায় নিজের নিটোল শরীরের ঠিকানায়। কেশব সেই সুযোগে বলে, "বলুন না, শুনে একটু শান্তি পাই। কী এমন আছে এ পৃথিবীতে যা আপনার পাওয়া হল না।" কৌশিক বলে, "এই ধর একটা ফেরারি, না থাক; ও তুমি বুঝবে না।" কেশব বলে, "এই দেখ! আপনি আবার ফেরার হবেন কেন? আপনার মত গণ্যমান্য ব্যক্তিত্ব, যদিও নামি-দামি মানুষজনের কেচ্ছার খবরই আজকাল খবরকাগজে বেশি দেখা যায়। কোথাও কিছু বাঁধিয়েছেন নাকি?" ডাক্তারের পিত্তি জ্বলে যায়। সে বলে, "ফেরার হব কেন? আমি কি চোর ডাকাত না খুনী ধর্ষক?" কেশব বলে, "পুলিশের খাতায় চোর জোচ্চোর নন; ঠিক। সমাজের খাতায় গণ্যমান্য ব্যক্তি; তাও বেঠিক নয়। তবে!" "তবে কী? কী বলতে চাইছ খোলসা করে বল তো!" কেশব বলে, "গরিবের আর কী বলার আছে স্যার? বলার যখন কিছু নেই তবে তাড়াতাড়ি চুল দাড়ি কাটো। গল্প করে সময় নষ্ট করব বলে নার্সিংহোম ফেরতা সন্ধ্যায় আসিনি। সাতটায় চেম্বার।"

তাড়াহুড়ো করে চেয়ার টেনে বসতে যায় ডাক্তার। ডাক্তারবাবু নিজের হাতে চেয়ার টানছেন! ডাক্তারের মান রাখতে কেশব মুহূর্তে চেয়ার জায়গায় টেনে দেয়। ডাক্তারের আন্দাজে ভুল হয়ে গিয়ে পতন অবশ্যম্ভাবী হয়ে যায়। কেশব মুন্সিয়ানা দেখিয়ে চট করে ধরে ফেলে ডাক্তারকে। ডাক্তার চটে আগুন হয়ে যায়। তড়িঘড়ি কেশব বলে, "আরে আপনি নিজেই তো বলেছিলেন ফেরার হওয়ার কথা।" কৌশিক বলে, "এই জন্যই অশিক্ষিত নাপিত চাষি কামার কুমোর এদের সাথে বেশি কথা বলতে নেই।" কেশব বলে, "তা বটে! এখন যারা আপনার কাছে চিকিৎসা করাতে আসে তারা কেউ এই দলের নয়।" ডাক্তার কেশবের দিকে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকায়। যে দৃষ্টির অর্থ খুঁজে না পেয়ে কাঁচিতে শান দিতে থাকে কেশব। ডাক্তার বলে, "কেশব হাত চালাও।" কেশব বলে, "চালাচ্ছি তো। একটা প্রশ্ন করি? আপনার মনে আছে মুখার্জী জ্যেঠু আপনাকে কীভাবে মানুষ করেছিলেন?" কৌশিক বলে, "মনে নেই আবার?" কেশব বলে, "পাড়ার মিত্র স্যারের প্রাইভেট টিউশন সেন্টার; মুখার্জী জ্যেঠু তখন ব্যবসায়ী সমিতির দোকানগুলোতে পুজো করতেন। যৎসামান্য আয়। লেখাপড়ায় ভালো দেখে মিত্র স্যার আপনাকে বিনা পয়সায় পড়াতে রাজি হয়ে গেলেন।" ডাক্তার বলেন, "কেন ফালতু কথা তুলছ? মিত্র স্যারের বাবার ভাগ্য যে আমার মত ছাত্র পেয়েছিলেন। কোচিংয়ে পড়ত, সব এলেবেলে ছেলেরা।" কেশব বলে, "তা ঠিক। মিত্র স্যার তাঁর নিজের ছেলেকেই মানুষ করতে পারলেন না। বেয়াড়া রাজনীতি করে বেঘোরে প্রাণ হারাল বিপ্লব। তবে ওঁর ছেলে লেখাপড়ায় খুব ভালো ছিল শুনেছি।" ডাক্তার বলে, "ও আমার ক্লাসে পড়ত। ভালো না মুণ্ডু। প্রশ্ন করে করে মাস্টারদের মাথা খারাপ করে দিত।" কেশব বলে, "এটা আপনি ঠিক বলেছেন। মাস্টারদের প্রশ্ন করা অন্যায়।" ডাক্তার বলে, "এতই যদি বোঝ তাহলে অকারণ প্রশ্নে আমায় জর্জরিত করে তুলছ কেন? এখন দেখছি তোমার দোকানে আসা ভুল হয়েছে।" কেশব হেসে বলে, "স্যার আপনি জানেন পার্লারে চুল কাটতে ৩০০ টাকা লাগে, তাই!" কৌশিক রেগে বলে, "তুমি ডাক্তার মুখার্জীকে টাকার খোঁটা দিচ্ছ?" কেশব বলে, "এটা আপনি ঠিক বলেছেন। মনে আছে আপনি দশ টাকায় রুগী দেখতেন?" ডাক্তার বলে, "মনে আছে বৈকি। তবে আজ আর তা মনে রাখতে চাই না। আর সেদিনের দশটাকা আজকে পাঁচশো টাকার সমান। আমি একশো টাকা কম নিই এখনও। আমার ফিজ চারশো টাকা; বুঝলে চাঁদু। আমার ওজনের ডাক্তার হাজার টাকা ফিজ দিয়েও পাওয়া যায় না।"

কেশব কিছু ভাবছে লক্ষ্য করে ডাক্তার বলে, "প্লিজ হাত চালাও।" হাতের বদলে মুখ চালিয়ে কেশব বলে, "স্যার আপনার কি মনে হয় আপনি সেদিনের সম্মান আজও পান?" ডাক্তার বলে, "তুমিই বল। তুমি কি আমায় সেই কৌশিক ডাক্তার বলে মানো না?" একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে কেশব কাঁচিতে সুর তোলে। উত্তর না আসায় ডাক্তার বলে, "কী হল? বল।" কেশব বলে, "আমি না, অন্যরা বলে। আপনি নাকি নার্সিংহোমে থেকে টাকা খান?" ডাক্তার বলে, "একদম বাজে কথা বলবে না। তা তোমরা বুঝি ভাজা মাছ উল্টে খেতে জানো না?" নিজের মাথায় হাত দিয়ে চুল টেনে ডাক্তার বলে, "ঠিকঠাক ছোট ছোট করে চুল কাটার কথা ছিল। কথা ছিল ঘাড় তুলে দেবে। আমাকে দু-মাসের মধ্যেই আসতে হল।" কথা না বলে কেশব চুল কাটতে থাকে।

কেশবকে চুপ থাকতে দেখে, ডাক্তার বলে, "এবার যেন চারমাস পর আসতে হয়।" কেশব বলে, "আমার বৌকে কিন্তু প্রত্যেক পনের দিন অন্তর যেতে হত।" ডাক্তার বলে, "সে তো প্রয়োজনে। ভালো থাকতে হলে সময়ে ডাক্তার দেখাতে হয়।" কেশব বলে, "আর সিটি স্ক্যান, এম আর আই আরও অন্যান্য কত কিছু করালেন; করার চেষ্টা করলেন---সেগুলো কার প্রয়োজনে বলবেন? আমার বৌ তো আপনার চেম্বারে যেতে রীতিমতো ভয় পেত।" ক্রুদ্ধ কৌশিক বলে, "তুমি ডাক্তারি শাস্ত্রের কী বোঝ হে? টিভি মোবাইল হয়ে আজ আর শালা অশিক্ষিত কেউ রইল না। ডাক্তারকেই প্রশ্ন করছে।"

কেশব জুলফিতে ক্লিপ চালানোয় ডাক্তারের সুড়সুড়ি লাগে। কেশবের হাতের আওতা থেকে মাথাটাকে বের করে নেয় ডাক্তার। উদাসীনভাবে ডাক্তারের মাথাটা নিজের দখলে নিয়ে কেশব নিজেকে বলে, "অনেক প্রশ্ন এখনও বাকি আছে স্যার।" প্রশ্ন করার সুযোগ না দিয়ে ডাক্তার বলে, "তোমার স্ত্রীকে সুস্থ করেছে এই মিঞা।" কেশব বলে, "নিশ্চয়ই; তবে শুধু সুস্থ নয়, আগে একটা অ আছে। আমি জানি আরও অনেক কিছু করার চেষ্টা করেছিলেন আপনি।" "তুমি কী মিন করতে চাইছ বলতো!" ডাক্তার জিজ্ঞেস করলে কেশব বলে, "অনেক কিছু। আমার স্ত্রী কোন অসুখে ভুগছিল মনে আছে?" ডাক্তার বলে, "নিশ্চয়ই মনে আছে। ভুলব কেন? তোমার স্ত্রী অণুর মানসিক রোগ ছিল। প্রাক্ বিবাহপর্বের রোগ। দেখেশুনে বিয়ের এই এক ঝামেলা। তার সঙ্গে পেটের নানা জটিলতা ও শ্বাসকষ্ট।" কেশব বলে, "আমি শুনেছিলাম শ্বাসকষ্ট মানসিক রোগের বহিঃপ্রকাশ। হঠাৎ মানসিক রোগের কী এমন কারণ ছিল বলতে পারেন?" ডাক্তার বলে, "অণুই বলতে পারে। তোমাদের ঘরোয়া কোন্দল কি আমার জানার কথা?" কেশব বলে, "আমি আপনাকে বিশ্বাস করেছিলাম। আর আপনি অণুকে…., যাক সে কথা। নিজের ভুল বুঝতে বড্ড দেরী করেছিলাম।" সন্ত্রস্ত ডাক্তার চেয়ে থাকে কেশবের দিকে। মুখে বুলি ফোটে না। কেশব বলে, "ততদিনে আঙুল বাঁকিয়ে ঘি তুলতে আপনি অণুকে বার কয়েক নার্সিংহোমে পাঠিয়েছেন।" ডাক্তার বলে, "ওর অক্সিজেন সাপোর্টের প্রয়োজন ছিল।" কেশব বলে, "আচ্ছা বাড়িতে এই চিকিৎসা সম্ভব ছিল না?" ডাক্তার বলে, "একেবারেই না।" কেশব বলে, "আপনি যে আপনার স্ত্রীর চিকিৎসা নার্স রেখে বাড়িতে করলেন?" ডাক্তার বলে, "ডাক্তাররা পারে।" কেশব বলে, "মনে আছে; অতীতে পাড়ার কোনো মানুষকে আপনি হাসপাতালে পৌঁছাতে দিতেন না। আপনি নিজে দাঁড়িয়ে আমাদের বাড়িওয়ালার চিকিৎসা তার বাড়িতে করিয়েছিলেন।" ডাক্তার বলে, "ওসব দিন ভুলে যাও। এখন ডাক্তারদের কোর্টকাছারিও সামলাতে হয়।" কেশব জিজ্ঞেস করে, "আপনি নার্সিংহোমে প্রায় নিয়ম করে অণুকে দেখতে যেতেন তাই না?" কৌশিক বলে, "পেশেন্টের প্রতি দরদী হতে হয় ডাক্তারকে।" কেশব বলে, "ও তাই বুঝি? অণু কি আপনার লালসা থেকে বাঁচতে বারবার ছাড়িয়ে নিয়ে আসতে বলত?" উত্তর আসে না ডাক্তারের কাছ থেকে, অথচ প্রশ্নবাণ ছুটে চলে নিরন্তর। "আমি টাকা দিতে পারব না জেনেও অণুকে কেবিনে রেখেছিলেন কেন? সুন্দরী মহিলা দেখলেই ভোগের আকাঙ্ক্ষা জাগে তাই না?" ডাক্তার বলে, "কেশব সীমা ছাড়িও না।" কেশব বলে, "আপনার অসীম ধৈর্য তাই বারবার চেষ্টা করে গেছেন। মোক্ষলাভ না হওয়ায় অন্যভাবে মারলেন আমাদের। যাকগে, যা গেছে তা যাক।"

স্যার আপনার মনে আছে আমার বিয়েতে কী কী মেনু হয়েছিল? প্রশ্নের মোড় ঘুরে যাওয়ায় ডাক্তার খুশি হয়। আগ্রহ নিয়ে বলে, "কী যে আবোলতাবোল বকো! মনে থাকবে না কেন? রসগোল্লা আর ছানার পায়েস।" কেশব বলে, "স্যার কত পিস খেয়েছিলেন মনে আছে?" ডাক্তার বলে, "থাকবে না আবার? আমি বিয়ে বাড়িতে পঁচিশ পিসের কম রসগোল্লা খেতাম না। আর অমন ছানার পায়েস! অপূর্ব! যদ্দূর আন্দাজ কেজি খানেক সাটিয়েছিলাম।" কেশব বলে, "স্যার কী উপহার দিয়েছিলেন মনে আছে?" ডাক্তার বলে, "উঁহু আমি সেকালে নিমন্ত্রণ বাড়িতে উপহার দিতাম না। অ্যাই কেশব আমায় অ্যাতো বকাচ্ছ কেন বলতো? কত পেশেন্ট অপেক্ষা করে আছে। ওরে বাবা! সাতটা পনের বেজে গিয়েছে।" কেশব বলে, "স্যার আমার হাত ফাঁকা; সময় অঢেল। তবে সেদিন সকলে জানত, রুগীর প্রতি ভালোবাসাই আপনার উপহার।" ডাক্তার বলে, "তাহলে বলছ?" কেশব জিজ্ঞেস করে, "স্যার, তখন একটা রসগোল্লা এক টাকায় পাওয়া যেত; তাই না? আর এখন দশ টাকা।" ডাক্তার অবাক বিস্ময়ে জিজ্ঞেস করেন, "তো কী?" কেশব বলে, "না কিছু না। আজ আপনি যে টাকা নেন তাতে চল্লিশটা রসগোল্লা পাওয়া যাবে। আগে দশটা পাওয়া যেত।" ডাক্তার কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলে, "কী বোঝাতে চাইছ সাফ সাফ বলতো বাছা।" কেশব বলে, "নড়বেন না। আপনার তো ব্লেড চলে না; আমার হাতে ক্ষুর আছে।" ভয়ে সিটিয়ে গেছে ডাক্তার। "অ্যাই তুমি কি আমায় ভয় দেখাচ্ছ?" কম্পিত ঠোঁটের উচ্চারণে বিকৃত হয়ে যা দুর্বোধ্য মনে হয়। কেশব কিন্তু কথার সঠিক মানে করেছে। সে বলে, "ধুস! আমাদের মত লোক যারা ভয়ে জীবন কাটায় তারা দেখাবে ভয়? আপনারা সমাজের মাথা বলে স্বীকৃত; আপনাদের ভয় পেতে নেই। জানেন, ক্ষুরটায় আজই শান দেওয়া হয়েছে।" ডাক্তার হঠাৎ করে ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে গিয়েছে। তার মুখ দিয়ে কথা বের হচ্ছে না। কেশব বলে, "সব মিলিয়ে যদি রক্ত পরীক্ষার হিসেব না ধরি তবুও বার তিনেক নার্সিংহোম বাবদ একলাখ তিরিশ আর আপনার আওতায় সরাসরি টেস্ট ভিজিট সব মিলিয়ে মোট পঞ্চাশ হাজার। আপনার কাছে এ আর এমনকি? তাই না? সেদিনের হিসেবে এক লাখ আশি ভাজিতক তিরিশ অর্থাৎ ছয় সহস্র জনের চুল কাটার বিনিময়ে অর্জিত টাকা। দিনে দশ জনের চুল দাড়ি কাটলে ছয়শত দিনের রোজ। মানে দুই বছরের কামাই। আচ্ছা স্যার, এর মধ্যে আপনার কত ছিল? মানে আমার কত দিনের রোজ খেয়েছিলেন আপনি?" কম্পিত কণ্ঠে ডাক্তার বলে, "বিশ্বাস কর কেশব।" কেশব বলে, "বিশ্বাস! বিশ্বাস করতাম যখন আপনি মানুষ ছিলেন। যেদিন গরিবের পকেট কেটে দেবতা হলেন, তারপর ডাক্তারির ছুতোয় পরনারী ভোগের অনৈতিক আকাঙ্ক্ষা মনে বাসা বাঁধল আপনার—না না, সেদিনও নয়। আরও অনেক আগে, যেদিন আপনি মুখার্জী জ্যেঠুকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন—আমার চোখ খুলেছিল সেদিন।" গুম হয়ে যায় ডাক্তার। ক্ষুরটা একটু জোরে টানা হয়ে যায়। ভয়ার্ত কণ্ঠে ডাক্তার চিৎকার করে ওঠে। কেশব বলে, "খুব ব্যথা লাগছে? গরিবেরও খুব লেগেছিল। আচ্ছা, আপনি খেয়াল করেছেন, গরিবে আপনার চেম্বারের পথ আর মাড়ায় না।" ডাক্তারকে নিরুচ্চার স্তম্ভিত দেখে কেশব বলে, "বলুন। আপনাকে আজ বলতেই হবে।" শানিত ক্ষুরের অবস্থান আড়চোখে দেখে নিয়ে ডাক্তার বলেন, "না মানে! আমি ঠিক ভেবে দেখিনি।" কেশব বলে, "ঠিক কবে থেকে ভাবনা ছাড়লেন?" ডাক্তার বলে, "তোমায় দাড়ি কাটতে হবে না, ক্ষুরটা সরাও প্লিজ।" কেশব বলে, "ডাক্তারবাবু আপনি কি শঙ্কিত?" ডাক্তার অনুনয়ের সুরে বলে, "ভাই কেশব, আমার তাড়া আছে। সাড়ে সাতটা বাজল; রুগীরা সব বসে আছে।" কেশব বলে, "ঠিক। আধ ঘণ্টা দেরী মানে ছয় গুণ চারশো; মানে চব্বিশশো টাকা সঙ্গে পরীক্ষা নিরীক্ষা থেকে আসা কমিশন। যার থেকে আমার শ্রমমূল্য পঞ্চাশ টাকা বাদ যাবে। আচ্ছা যান। আমার টাকা দিতে হবে না। আপনি এমনিই চলে যান।" ডাক্তার বলে, "কেশব ভাই, আমার দাড়িটা অর্ধেক কাটা পড়েছে। এই অবস্থায় আমি কী করে যাব বল।" কেশব বলে, "মনে আছে স্যার, আমার জমি অর্ধেক বিক্রি করতে হবে এমন অবস্থায় আপনাকে অনুরোধ করেছিলাম। পারিবারিক ঘনিষ্ঠতার সুবাদে আপনি জানতেন মেয়ে-জামাইয়ের অ-বনিবনার কারণে আমার স্ত্রী মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিল। আমরা আপনার শরণাপন্ন হয়েছিলাম। ভেবেছিলাম কাউন্সেলিং করাবেন। অথচ আপনি রোগের ফিরিস্তি দিয়ে গলা কাটলেন। বদলে অন্য কিছু পেলে হয়তো গলা কাটতেন না। আজ আপনার ধড় মুড়ো আমার ক্ষুরের আগায়। বলুন আক্কেলসেলামি কত ধার্য করব? যদিও জানি আক্কেল আপনি খুইয়েছেন ডায়াগনস্টিকস, ওষুধ কোম্পানি আর নার্সিংহোম থেকে পাওয়া উৎকোচের কারণে।"

ডাক্তার লাফ দিয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠতে চেষ্টা করে। ততোধিক তৎপরতায় কেশব ডাক্তারকে চেয়ারে ঠুসে ধরে। চেয়ারে বসে একপাশে ঘুরে ডাক্তার নিজের পকেট হাতড়ায়। পাঁচশো টাকার দুটো নোট বের হয়ে আসে। কেশবের চোখে চোখ মিলিয়ে কিছু বলতে চায় ডাক্তার। কেশব মাথা নাড়ে। ডাক্তার কেশবকে অনুরোধ করে বেঞ্চে রাখা অ্যাটাচিটা এনে দিতে। ক্ষুর উঁচিয়ে রেখেই কেশব ব্যাগ নিয়ে আসে। তড়িঘড়ি লক খুলে কৌশিক তাড়া তাড়া পাঁচশো টাকার বাণ্ডিল সেলুনের আয়না রাখার স্ট্যাণ্ডে সাজিয়ে রাখতে থাকে। হঠাৎ তীব্র চিৎকার করে কেশব ককিয়ে ওঠে। কৌশিক ডাক্তার সেই সুযোগে পালানোর চেষ্টা করে।

ঠিক সেই সময়ে অণুর আগমন ঘটে। গতি রুদ্ধ হয় ডাক্তারের। ভয়ার্ত অণু বলে, "হচ্ছেটা কী?" অণু উদ্যত ক্ষুরের সামনে নিজেকে দাঁড় করানোর চেষ্টা করলে কেশব ডাক্তারের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। ভীত ডাক্তার মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে। অণুর পায়ের কাছে তার শরীর। করজোড়ে প্রাণভিক্ষা চাইছে ডাক্তার। ডাক্তার বলে, "অণু বাঁচাও।" অণু বলে, "আপনার হাত থেকে সম্মানে বাঁচলেও ধনেপ্রাণে বাঁচতে পারিনি।" কেশব বলে, "শিক্ষা আপনাদের মানুষের রক্ত চোষায় পারদর্শী করে তুলেছে। সাধারণ মানুষের মগজে তালা তারা ভাবতেই চায় না। আচ্ছা ডাক্তার, নিজের বিবেকের তালা খোলা সম্ভব?" ডাক্তার বলে, "বৌমা তোমাদের সঙ্গে যা হয়েছে, ভুল হয়েছে। আমি ক্ষতিপূরণ দিতে রাজি।" কেশব বলে, "বাঃ! জানা ছিল না শানিত ক্ষুর মগজ ধোলাইয়ে পারদর্শী।" স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে কেশব বলে, "টাকার সবকটা বাণ্ডিল খুলে ফেল।" যন্ত্রবৎ অণু নিমেষে খুলে ফেলে সবকটা বাণ্ডিলের বাঁধন। ক্ষুর হাতে কেশব নীচু হতে থাকে। ডাক্তার চিৎকার করতে চায় কিন্তু তার গলা দিয়ে স্বর বেরোয় না।

কেশব বলে, "মৃত্যুভয় কাকে বলে বোঝ। সেদিন আমার স্ত্রীর মৃত্যুভয়ে সর্বস্বান্ত হয়েছিলাম আমরা। দিন আনা দিন খাওয়া আজ আমাদের ভবিতব্য। আর তোমরা টাকার পাহাড়ে বসে গরিবকে নিঙড়ে রস খাও। ডাক্তারি শিক্ষা হল আখমাড়াই কল।" অণু বলে, "ঘরের বাতি নিভিয়ে দাও।" একই সাথে দুজনে বিপরীত কারণে বলে ওঠে, "নাঃ।" কেশব হেসে অণুর কাছ থেকে টাকার বাণ্ডিলগুলো নিয়ে এক এক করে ওড়াতে থাকে। কৈশোরে ভোকাট্টা ঘুড়ির পেছনে ছোটার আবেগ নিয়ে ডাক্তার দেখতে থাকে সহস্র ভোকাট্টা ঘুড়ি চেত খেয়ে পড়ছে। উড়তে থাকা টাকা ধরতে হাত বাড়ায় ডাক্তার। ভয়ে শরীর সায় দিচ্ছে না। কিন্তু আকাঙ্ক্ষার মরণ নেই।

কেশব চিৎকার করে বলে চলেছে, "একজনের সমৃদ্ধির অশ্লীল ইচ্ছায় শত শত গরিবের রক্ত জল করা টাকা পতপত করে উড়ছে। শালা আমায় কিনতে চেয়েছিল। আমি জাত শ্রমিক। নিজের ঘাম ঝরানো টাকার অধিকার আমার। কারও পয়দা খাই না।" ডাক্তার ভয়মিশ্রিত চোখে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে। ক্ষুর হাতে নটরাজ নৃত্যে মত্ত কেশব। কৌশিক ডাক্তারের হাতঘড়ি অনুরূপ ছন্দে টিকটিক বেজে চলেছে। অণু বলে চলেছে, "পাগলামি কোরো না, থামো।" কান্নায় গলা ধরে আসে অণুর।




আপনি কি লিখতে ভালোবাসেন?

বাঙালি.নেটওয়ার্ক-এর ‘উদ্যোগ’ ই-পত্রিকার মার্চ সংখ্যা প্রকাশিত হবে ১৫ মার্চ। ওয়েবসাইটে ঘোষিত বিভাগগুলি থেকে আপনার পছন্দের এক বা একাধিক বিষয়ে লেখা পাঠান ৮ই মার্চের মধ্যে। লেখা পাঠানোর আগে অতি অবশ্যই শর্তাবলী পড়ুন। নির্বাচিত লেখাগুলি লেখক / লেখিকার ছবি ও সংক্ষিপ্ত পরিচিতিসহ Bangali.Network ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হবে, এবং ১০ জন পর্যন্ত লেখক / লেখিকা পাবেন 'মাসের সেরা কলম' সম্মান। বিশদে জানতে ও আপনার লেখা পাঠাতে এখানে ক্লিক করুন।

পৃষ্ঠা
ভালো লাগলে ভালোবাসা দিন
অপছন্দ হলে পরামর্শ দিন
মতামত জানাতে Comment করুন
4.7 9 ভোট
স্টার
guest
7 কমেন্ট
নতুন থেকে পুরোনো
পুরোনো থেকে নতুন ভোটসংখ্যা অনুসারে
ইনলাইন প্রতিক্রিয়া
সকল কমেন্ট দেখুন
সুস্মিতা মুখার্জী
সুস্মিতা মুখার্জী
পাঠক
1 মাস আগে

বর্তমান সমাজের বাস্তবিক গল্প । ভালো লাগলো।

কমল মুৎসুদ্দি
কমল মুৎসুদ্দি
পাঠক
1 মাস আগে

কৃশানু দা, বাস্তবের বাস্তবায়ন কলমের দ্বারা।

Mainak
Mainak
পাঠক
2 মাস আগে

Chalie jan🙏

সৌমী চ্যাটার্জী
সৌমী চ্যাটার্জী
পাঠক
2 মাস আগে

বর্তমান সমাজের এক কঠিন বাস্তবকে এই লেখার মাধ্যমে তুলে ধরার জন্য ধন্যবাদ। গল্পের চরিত্র- ‘কৌশিকবাবুর’ মতো মানসিকতার মানুষদের বোধদয় হোক এই কামনা করি। এইরকম প্রতিবাদ তোমার কলমে আবার গর্জে উঠুক।

অরিন্জিত বসু
অরিন্জিত বসু
পাঠক
2 মাস আগে

অপূর্ব! বর্তমান সমাজের ডাক্তারি শিল্পকে তুলে ধরলেন কত অবলীলায়🙏🙏

কৃশানু মিত্র
কৃশানু মিত্র  Voice of Udyog
পাঠক
উত্তর →  অরিন্জিত বসু
2 মাস আগে

শিল্পই বটে, তবে শিল্পী নয় বেনিয়া।

রাতুল মুখোপাধ্যায়
রাতুল মুখোপাধ্যায়
পাঠক
2 মাস আগে

খুব ভালো লেখা। এই লেখায় শ্রমজীবী মানুষের অসহায়তা যেমন ফুটে উঠেছে আবার দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে শ্রমিকের প্রতিবাদের ভাষাও কি হতে পারে তা বোঝা যাচ্ছে। আরও লেখার প্রতীক্ষায় রইলাম।

udyog logo 2026 bangali.network

বিভিন্ন বিষয় থেকে বেছে নিয়ে লেখা পড়ুন

    বিভিন্ন সংখ্যায় প্রকাশিত হওয়া লেখা পড়ুন

    পূর্ববর্তী মাসিক সংখ্যাগুলি দেখুন
    ফেসবুক পেজ
    Scroll to Top