আজকালকার ব্যস্ত আধুনিক জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত বিবাহিত দম্পতিদের সন্তান নেওয়ার সময় বা প্রবণতা — দুটোই বেশ কমে গেছে। শহরের দিকে উচ্চ এবং মধ্যবিত্ত দম্পতির অধিকাংশই নিজেদের ক্যারিয়ারের স্ট্রেস এবং অন্যান্য বিষয় নিয়ে এতটাই ব্যস্ত যে দিনের শেষে হয়তো নিজেদের ঠিকমতো সময়টুকুও দিয়ে উঠতে পারেন না; সন্তান ধারণ তো অনেক পরের কথা!
আর আধুনিক জীবনযাত্রার এই জায়গাতেই উত্থান ঘটছে এই 'DINK' কনসেপ্টের — DINK অর্থাৎ Dual/Double Income with No Kids। অল্প কথায় বলতে গেলে, এক্ষেত্রে দেখা যায় বিবাহিত দম্পতির দুই পক্ষ চাকরিরত, আর্থিকভাবে সচ্ছল এবং শারীরিকভাবে সুস্থ হওয়া সত্ত্বেও স্বেচ্ছায় সন্তানহীন থাকেন, প্রভূত সামাজিক এবং পারিবারিক চাপকে উপেক্ষা করে।
এই DINK কনসেপ্টের প্রথম আবির্ভাব ঘটেছিল ১৯৮০-এর আশপাশে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। একদল শিক্ষিত তরুণ-তরুণী সদ্য বিবাহের পরেই সমস্ত দেশব্যাপী আর্থিক মন্দা, চাকরির অনিশ্চয়তা, সামাজিক এবং পারিপার্শ্বিক চাপের মুখে দাঁড়িয়ে এই বিশেষ ধরনের জীবনশৈলী বেছে নিয়ে গতানুগতিক পরিবারপ্রথার মুখে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছিলেন। সর্বপ্রথম ১৯৮৭ সালে Amy Virshup নামে নিউইয়র্ক ম্যাগাজিনের একজন সম্পাদক এই টার্মটি ব্যবহার করেন তাঁর লেখায়, আর এখান থেকে বিভিন্ন পত্রপত্রিকা এবং চলচ্চিত্রের মাধ্যমে ধীরে ধীরে এই কনসেপ্ট সারা পৃথিবীতে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
ভারতীয় ঐতিহ্যবাহী চিন্তাভাবনা বা পরিবারপ্রথার সম্পূর্ণ বিপরীত এই কনসেপ্ট এখন এই দেশেও বেশ জনপ্রিয়। সচেতনভাবে এই টার্মটি ব্যবহার না করেও বিবাহিত, আর্থিকভাবে সচ্ছল, শারীরিকভাবে সক্ষম দম্পতিদের অনেকেই এই পথে হাঁটছেন। কর্মব্যস্ত জীবনে দিনের শেষে পরস্পরকে সময় দেওয়া, শুধু নিজেদের মধ্যে মানসম্মত সময় কাটানোতে অভ্যস্ত হয়ে উঠছেন অনেকেই। হাতে ছুটি জমলেই ছোটোখাটো ভ্রমণ, সপ্তাহান্তে চলচ্চিত্র নয়তো রেস্তোরাঁয় দুপুরের খাবার। অবসর সময়ে জিম, যোগা, লেখালিখি, কখনও বা সঙ্গীত বা নৃত্য, নয়তো অঙ্কনচর্চা। নিজেদের উদ্বৃত্ত সময় এবং অর্থকে নিজেদের সার্বিক উন্নয়নের কাজে লাগাচ্ছেন আধুনিক দম্পতিরা।
অনেকেরই মতে, সন্তান ধারণ এবং তাকে লালন-পালন, তার সুস্থ সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে দেওয়া, তাকে শিক্ষিত করে তোলা, প্রকৃত মানুষ করে তোলা — পুরো ব্যাপারটাই বেশ সময়সাপেক্ষ এবং ধৈর্যসাপেক্ষ। তার থেকে এই নবাগত তরুণ প্রাণের পিছনে নিজেদের জীবনের সেরা সময় এবং সম্পদ ব্যয় না করে, সেগুলো নিজেদের পিছনেই খরচ করছেন আধুনিক দম্পতিদের একাংশ।
সন্তান ধারণের পিছনে খুব সামান্য হলেও একটা প্রত্যাশা থাকে — নিজেদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত রাখার। অর্থাৎ দম্পতি নিজেদের যৌবনের যে সময় এবং সম্পদ সন্তানের প্রতিপালনে ব্যয় করছেন, তাঁদের প্রত্যাশা থাকে সন্তান বড় হয়ে উঠলে সেই সময় এবং সম্পদ ফিরিয়ে দেবে তার পিতা-মাতাকে, অর্থাৎ সে হয়ে উঠবে তাঁদের বৃদ্ধাবস্থার আশ্রয়স্থল। কিন্তু সব সময় কি সেটা সত্যিই হয়? সন্তান বড় হলে কতটা সম্ভব হয় তার পক্ষে তার পিতা-মাতার ভরসার স্থল হয়ে ওঠা? কতজনের পক্ষে সম্ভব হয় তাঁদের সেবা করা বা দরকারের সময় পাশে দাঁড়ানো? পুরোটাই তো অনাগত ভবিষ্যতের এবং পরিস্থিতির হাতে!
ঠিক এইখান থেকেই শুরু হয় DINK কনসেপ্টের। ভবিষ্যৎ জীবনে আমার সন্তান আমাকে দেখবে — এই চিন্তাভাবনা থেকে সরে এসে নিজেদের জীবনে বিনিয়োগ, সম্ভব হলে নিজের বৃদ্ধাবস্থার কথা ভেবে আগে থেকেই সঞ্চয় করা, বৃদ্ধাবাসে আগে থেকেই নাম নথিভুক্ত করে নিজেদের বর্তমানটুকু আঁকড়ে ধরে বাঁচা।
দোষ নেই কোনো পক্ষেরই — স্বাধীন চিন্তাভাবনার এবং নিজের ইচ্ছামতো জীবন কাটানোর অধিকার আছে সকলেরই। সমস্যা ডেকে আনে সামাজিক এবং পারিবারিক চাপ। ঐতিহ্যবাহী চিন্তাধারার ভারতীয় সমাজ এই আধুনিক চিন্তার বিশ্বাসীদের "স্বার্থপর", "দায়িত্ব নিতে চায় না" — এইরকম বিভিন্ন উপাধিতে ভূষিত করে সবসময়ই। যা গতানুগতিক নয়, তাই যেন সর্বদা বর্জনীয়!
অথচ দুজন পূর্ণবয়স্ক মানুষ নিজেদের সম্মতিতে সন্তানহীন থাকলে তাতে সমাজের কী সমস্যা হয়, তা সত্যিই বোঝা মুশকিল! সন্তান এবং পিতা-মাতার সম্পর্ক তো কোনো ব্যবসায়িক সম্পর্ক নয়, যে নিজেদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করার জন্য এই জরুরি বিনিয়োগটুকু করতেই হবে! নিজেদের ইচ্ছায় নিজেদের ভালোবাসার সন্তানকে পৃথিবীতে আনার বা না আনার অধিকার সকল দম্পতিরই আছে। অথচ এই সামান্য অধিকারটুকু প্রয়োগ করতে গেলেই বিপুল পরিমাণ সামাজিক এবং পারিবারিক চাপের মুখোমুখি হতে হয় এই দম্পতিদের!
জীবনটা তাঁদের — এইটুকু বোঝার ক্ষমতাও যেন চলে যায় তথাকথিত শুভাকাঙ্ক্ষীদের!
তবে ঘরে-বাইরে বিপুল পরিমাণ প্রত্যাশার চাপ সামলেও ধীরে ধীরে তরুণ প্রজন্ম নিজেদের পছন্দমতো জীবনশৈলী বেছে নিচ্ছেন। DINK couple-দের মধ্যেও এখন এসেছে আরও প্রকারভেদ —
🔸 DINKWAD — double/dual income, no kids with a dog couple; যাঁরা নিজেদের সন্তান হিসেবে কুকুরশাবককে প্রতিপালন করেন
🔸 GINK — green inclinations, no kids; পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার উদ্দেশ্যে নব প্রজন্মকে না আনা
🔸 DINKER — double income, no kids, early retirement; এই ক্ষেত্রে দম্পতিরা নিজস্ব সন্তান আনেন না, নিজেদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করার জন্য মনোমতো অবসর পরিকল্পনায় বিনিয়োগ করেন
এর সঙ্গে সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির দিকে তাকিয়ে মাথায় রাখা উচিত — এই রাজ্য তথা দেশের পরিবেশ সত্যিই কি নব প্রজন্মের জন্য উপযুক্ত? শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ভবিষ্যতে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্য উপযুক্ত চাকরি — কোনটা সহজে পাওয়া যায় এই দেশে? তার সঙ্গে বিশুদ্ধ বাতাস, পানীয় জল, বিশুদ্ধ খাদ্য, ন্যূনতম নাগরিক সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য, জীবনের সুরক্ষা, নিরাপত্তা — কোনোটাই সুলভ নয় এখানে।
এ কি সত্যিই উপযুক্ত পরিবেশ একটি নতুন প্রাণের জন্য?!
যাঁরা স্বেচ্ছায় সন্তানহীন থাকেন, কোথাও না কোথাও তাঁদের অনীহার পিছনে লুকিয়ে থাকে এই মানসিক টানাপোড়েন, অনাগত সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগও।
পরিশেষে বলতে চাই, ব্যতিক্রমী চিন্তাধারা থাকলেই তাদের "স্বার্থপর", "দায়িত্বজ্ঞানহীন" হিসেবে দাগানো বন্ধ করে ঠান্ডা মাথায় একবার বর্তমান পরিস্থিতির কথা ভাবা উচিত।
সন্তান ধারণ করে গতানুগতিক ধারা মেনে জীবনযাপন করা, বা নিজেদের ভবিষ্যৎ নিজেদের মতো করে সুরক্ষিত করে জীবন কাটানো — দুটোই সমান গ্রহণযোগ্য হওয়া উচিত। কোনোটার জন্যই কোনো দম্পতিকে অপরাধীর কাঠগড়ায় দাঁড় করানো উচিত নয়।
নিজেদের জীবনের সিদ্ধান্ত যেকোনো দম্পতির একান্তই ব্যক্তিগত ব্যাপার — তাতে নাক গলানো বা তাঁদের অযাচিত উপদেশ দিতে যাওয়াটা তাঁদের ব্যক্তিস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের সমান!
তার থেকে যে মানুষ যেভাবে বেঁচে থেকে এই অসুখী জীবনে সুখ খুঁজে নিচ্ছেন, তাঁকে সেইভাবেই বাঁচতে দেওয়া উচিত। বর্তমান যুগের জটিল সময়ে সুস্থভাবে বেঁচে থাকাটাই যথেষ্ট কঠিন, তাই অনর্থক সামাজিক চাপ দিয়ে কারও বেঁচে থাকাটা আরও কষ্টকর করে না তুলে একটু সহনশীল তো হওয়াই যায় — তাই না?
আপনার ভোটেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
বিস্তারিত নিয়ম
প্রতিটি কলম প্রতিক্রিয়াই একবার করে দেওয়া যাবে, তবে প্রয়োজনে সেই প্রতিক্রিয়া পরিবর্তন করা সম্ভব। কোনো লেখায় একটি কলম প্রতিক্রিয়া দেওয়ার পর, একই মাসে অন্য কোনো লেখায় সেই একই কলম প্রতিক্রিয়া নির্বাচন করলে আগের প্রতিক্রিয়াটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে, রয়ে যাবে সর্বশেষ প্রতিক্রিয়াটি। এই প্রতিক্রিয়াগুলির মাধ্যমেই নির্বাচিত হবেন ‘মাসের সেরা কলম’ সম্মানের ‘পাঠকের প্রতিক্রিয়া’ পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক–লেখিকারা।