পুকুরে শালুক ফুল আলো জ্বালিয়ে রেখেছে জলজ রাস্তায়। কৃষিকাজ শুরুর ইতিহাস স্বপ্নছবি হয়ে আছে। সবুজ গাছ প্রথম থেকেই ছিল। গাছপালার ডাল কেটে ধারালো করে মাটি খুঁড়ে বীজ ছড়িয়ে দেখা গেল সবুজ শস্যের জীবন। তারপর ধীরে ধীরে লৌহযুগে মানুষের কিছুটা সুরাহা হলো। লোহার কোদাল, দুনি, গোরুর গাড়ির চাকা, লাঙল প্রভৃতি তৈরি হলো। গোরু বা মোষের কাঁধে লাঙল বেঁধে বোঁটা ধরে ধীরে ধীরে সারা জমি কর্ষণ করা হতো। মাদা কেটে দুনি দিয়ে পুকুরের জল জমিতে ফেলা হতো। তারপর বীজ ছিটিয়ে বিভিন্ন শস্যের উৎপাদন করা হতো। আলের বার নেওয়া, বীজ মারা, মাদা, দুনি, মুনিষ, ছিটেন মারা, বীজ পোঁতা, নিড়েন দেওয়া — এসব চাষবাসের আঞ্চলিক কথা বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন রকম হয়ে থাকে।
হেমন্ত কাকা, বড়দা, মদনকাকা কৃষিকাজে অভিজ্ঞ ছিলেন বলে গ্রামের সবাই পরামর্শ করতে আসতেন বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে। সন্ধ্যাবেলা পাড়াগাঁয়ের মুনিষরা সকলে কাজের ফাইফরমাশ শুনে সকালে জমিতে গিয়ে সেইসব কাজ করত। জমি দেখতে সকালে জলখাবার নিয়ে যেত বাড়ির ছোটোরা। দুপুরে যখন মুনিষরা ভাত খেত, সে দেখার মতো ব্যাপার হতো। বড়ে বড়ো জামবাটিতে ভর্তি ভাত, মোটা তরকারি, ডাল, মাছ, চাটনি, কাঁচালঙ্কা আর পিঁয়াজ। কী সুন্দর শৈল্পিক ছোঁয়া খাওয়ার মধ্যে। কেটিপতিরা খাবার সময় এই আনন্দ পায় কি? আমার মনে হয় পায় না। খাওয়ার আনন্দ পেতে গেলে খিদে চিনতে হয়। আর খিদের মতো উপহার পেতে গেলে দৈহিক শ্রমের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে হয়। তা বলে শুধু খিদের জ্বালায় জ্বলতে কার ভালো লাগে? কবে আসবে সেই দিন, সব খিদে পাওয়া মানুষগুলো পেট ভরে খেতে পাবে? আমার বড়দা সব সময় এই কথাগুলি বলে থাকেন।
একটা অজ পাড়াগাঁয়ের কাহিনি বড়দা আমাদের বলতেন। বড়দার বন্ধু মদনকাকা। বয়সে বড় হলেও মদনকাকা বড়দাকে বন্ধু হিসেবেই দেখতেন। আজও বড়দা তার কথায় বলছেন। তিনি বলছেন, গল্প হলেও সত্য কাহিনি। বড়দা বলতে শুরু করলেন তার বন্ধু ও সেই গ্রামের কথা।
শরতের শেষ সময়। ধানগাছে দুধ হয়েছে। গ্রামবাসীদের খুব আনন্দ। আর ক' দিন পরেই সোনার ধান ট্রাকটরে চেপে রাস্তা আলো করে ঘরে ঘরে ঢুকবে। কিন্তু সে গুড়ে বালি। ছাড়া জলে ডুবে গেল গর্ভবতী ধানগাছ। প্রকৃতি বিরূপ হয় না এতটা। মানুষের মনের কথা প্রকৃতি অনেক ভালো বোঝে। কথাটা বললেন সহজ-সরল মাটির মানুষ মদনকাকা।
মদনকাকা অনেক মজার কথা বলেন। কোথা থেকে জানেন জানি না। সুমিত বলল। সে আরও বলল, আমি এই গ্রামের ছেলে। ছোটো থেকেই দেখে আসছি মদনকাকার চলাফেরা, কথাবলা আর জ্ঞানের অফুরন্ত ভান্ডার। তার চিরকালের সঙ্গী রেডিও। যেখানেই যান, রেডিও ছাড়া যান না। সব সময় খবর শোনেন। তিনি বলেন, রেডিও আর টিভির মূল বিষয় আমার মতে এই খবর বিভাগটি। মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা তার ধর্ম।
কত জটিল বিষয় তার কাছে জানতে গেলেই সহজ জলের স্রোতের তিরতির শব্দে অন্তরে প্রবেশ করে অচিরেই। দুর্গাপুজোর পরেই সাধারণ মানুষের মনে একটা ঘুঘুর একঘেয়ে ডাক ডেকে চলে অনবরত। গ্রামবাসীরা সকলেই এই সময় একটু হাত-পা মেলে বসেন মুক্ত আকাশের বিহঙ্গের মতো। কোনো অভাবের দাগ থাকে না অন্তরে। এই গ্রামগুলোই ভারতবাসীর প্রাণ, গান।
কায়স্থ পাড়াতেই মদনকাকার চোদ্দ পুরুষের ভিটে। বিশে ওই মদনকাকার গুষ্টিরই ছেলে। লতায়-পাতায় বংশবৃদ্ধির কারণে একটা বাড়ির লোকজন বেড়ে চোদ্দ পুরুষের লাইন ধরে এক-একটা পাড়ার সৃষ্টি করেছে। কোনোটা ঘোষালপাড়া, কোনোটা ডোমপাড়া, আবার কোনোটা ডেঙাপাড়া। এক-একটা গ্রামে কুড়ি থেকে তিরিশটা পাড়া থাকে।
মদনকাকার মতো বয়স্ক লোকেরা পরিচালনা করেন এই উৎসব। রাতে বোলানের গান শুনতে শুনতে ঘুমে ঢুলে পড়েন কাকা। তবু মণ্ডপতলার গানের আসরেই সারা রাত বসে থাকেন। তার সঙ্গে প্রচুর ছেলে, মেয়ে, আপামর শিশু থেকে বৃদ্ধ সকলেই ওই আনন্দ আসরেই রাত কাটান। সমস্ত দলাদলি, ঝগড়ার হিসেব-নিকেশ হয়ে যায় এই রাতেই, বলতেন কাকা। এই আকর্ষণ ছেড়ে অন্য কোথাও যায় না গ্রামের মানুষ।
কাকার বাড়ির শহরের এক কুটুম এই কাহিনি শুনে আনন্দিত। কাকা বললেন, "নতুন কুটুম গো, তোমাকে বলছি, আমাদের এখানে এসে একবার গাজন দেখে যেও। খুব ভালো লাগবে।"
অনেক গ্রামবাসী মদনকাকার আশেপাশে বসে পড়েছে, গল্প শোনার জন্য। কাকা গল্প বলার ফাঁকে ফাঁকে অনেক ভালো ভালো উপদেশমূলক কৌতুক কথাও বলে থাকেন। মুড তার সব সময়ই ভালো। কথায় কথায় বলেন, "পেটে ক্ষিদে নিয়ে কিছু হয় না। ধর্ম, শিক্ষা, কাব্য, গল্প — কিস্যু হয় না।" নবীন বলল, "ঠিক বলেছেন কাকা। আগে পেট, তারপর অন্যকিছু।"
মদনকাকা আবার শুরু করলেন কথা বলা। তার কথা সবাই শোনে। কিছু শেখে মানুষ। বলছেন, "যুগে যুগে একটা নিয়ম চালু আছে। দেখবে, প্রথম স্তরের good student ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার হন। দ্বিতীয় স্তরে এসডিও বা বিডিও হন। তারা প্রথম স্তরকে শাসন করেন। মানে ডাক্তাররা বা ইঞ্জিনিয়াররা তাদের খুব 'স্যার স্যার' করেন, প্রথম শ্রেণির হয়েও। আবার তৃতীয় স্তরের student নেতা হয়। তারা order করে বিডিও বা উঁচু স্তরের অফিসারদের। আর চতুর্থ শ্রেণির studentরা হয় সাধুবাবার দল। নেতারা সব লুটিয়ে পড়ে তাদের চরণতলে। ভোট এলেই বাবার পুজো দিয়ে আশীর্বাদ নিতে আসেন গণ্যমান্য নেতার দল।"
"তাই বলে কি সংসারে সাধু লোক নাই? নিশ্চয় আছে। তারা সংসারে আছেন গোপন সাধনায়। লোক দেখানো ভড়ং তাদের নাই। আর মন্ত্রী হওয়ার ক্ষেত্রে minimum regular master's degree থাকা আবশ্যিক করুক সরকার। আর ভোট দেওয়া হোক বাড়িতে বসে আধার কার্ড লিঙ্ক করে। জালিয়াতি দূর হোক। সবাই বলো, জয় সাধুবাবা।"
নবীন বলল, "আপনি ঠাকুরের নাম ছেড়ে, 'জয় সাধুবাবা' বলেন কেন?"
— "আরে বাবা, দেখবি মানুষের কিছু মুদ্রাদোষ থাকে। ধরে নে তাই।"
— "না না, আপনি এড়িয়ে যাচ্ছেন। বলুন কেন।"
— "তাহলে শোন। এখন সাধু মানুষ, কোটিতে গুটি। সব সং সাজার সাধু। তাই যারা সত্যিকারের সাধু, তাদের শ্রদ্ধা জানিয়ে জয়ধ্বনি দিয়ে থাকি। ওই যে, মহাপুরুষের বাণী শোনোনি — 'সাধু হও, সাধু সাজিও না। সংসারী সাজিও, সংসারী হইও না।'"
— "কাকা, আপনি আছেন বলেই কঠিন কথা সহজ করে বুঝতে পারি। তা না হলে কিছুই জানা হতো না।"
— "শুধু জানলেই হবে না। বাস্তবে, কাজে, কম্মে ব্যবহার দিয়ে দেখিয়ে দাও দিকিনি বাছা। তবেই বলব বাহাদুর বাবা। খুব একটা সহজ নয় বাবা।"
আবার আগের প্রসঙ্গে ফিরে গিয়ে কাকা সবাইকে বললেন, "তাহলে কী হলো ব্যাপারটা। আগের কথায় ফিরে যাই। Man-made flood। আর নয়, আধুনিক কবিতার মতো বাকিটা বুঝে নাও। বলো, জয় সাধুবাবা।"
সবাই বলল, "জয় সাধুবাবা।"
"মানুষ মরছে বানে, আর উনি জয় সাধুবাবা বলে পাড়া মাত করছেন," আপন মনে বলল পাড়ার শিবু কায়েত।
শিবু কায়েত শিবে বলেই পরিচিত। হঠাৎ কুটুমজনা বলে উঠলেন, "দেখুন, ওই গোরের ঘাটে কে বসে?" কাকা বললেন, "তুমি জানো না, কিন্তু আর সবাই জানে। ও হলো মানে মাল। ওকে শিবে বলেই পাড়ার লোকে ডাকে। বুদ্ধি খুব। কথায় বলে না, কায়েতি কায়দা। বোঝে রসের রসিক। তুমি আমি ছারপোকা।"
বললেন মদনকাকা। "ছোটো থেকেই চালাকি বুদ্ধি ছিল তার অসম্ভব। last bench-এর ছেলে। বড়োদের সম্মান করত না। তাদের সামনেই সিগারেট ফুঁকে বাহাদুরি দেখাত শিবে। বাবা, মা বড়ো আশা করে তাকে স্কুলে পাঠান। কিন্তু স্কুলের নাম করে সে মানুষকে জ্বালাতন করত দিনরাত। তার জ্বালায় সকলেই বিরক্ত। এমনি করেই সে বয়সে বড়ো হলো। তার বাবা, মা একে একে মরে গেল। এখন সে একা। তবু তার স্বভাব পাল্টাল না।"
শিবু কায়েত বানের পরে সেই যে কোথায় নিরুদ্দেশ হলো, কেউ জানে না। মদনকাকা বলেন, "আমি জানি, কিন্তু প্রকাশিত হবে ক্রমশ। একবারে নয়। আমি যেদিন স্তরবিন্যাস করেছিলাম, সেদিন শিবে চুপ করে গোরের ঘাটে বসে ছিল। হুঁ, হুঁ বাবা, আমি দেখেছি। ও আড়ালে-আবডালে সুযোগ খোঁজে। আলোকে ওই বেটা ভয় পায়। আমাদের কায়েত বংশের কুলাঙ্গার। ভালো হলে আমরা আছি, আর খারাপ হলে মানুষ ছাড়বে না বাবা। তোমার সব সাত চোঙার বুদ্ধি এক চোঙায় যাবে। বাদ দাও, বাদ দাও। বলো, জয় ভবা, জয় সাধুবাবা।"
সকলেই বলল, "জয় ভবা, জয় সাধুবাবা।"
মদনকাকা বানের পরে ক্ষতিপূরণবাবদ কিছু টাকা পেয়েছিলেন। গ্রামের সকলেই পেয়েছিলেন। সেই টাকাতেই সকলের বছরটা চলেছিল। নীচু এলাকা বলে খরার চাষটা এখানে ভালোই হয়। আর বর্ষাকালে ভরসা নাই। অজয়ের গাবায় চলে যায় বর্ষার ফসল। সেইজন্যে অনেকে নামলা করে চাষ দেয়। আর তাহলে কিছু ধান ঘরে ঢোকে। যতই বান-বন্যা হোক, চেষ্টাতো করতেই হবে। কথায় বলে, আশায় বাঁচে চাষা। মনে মনে কত স্বপ্ন, গাথা। জমি ফেলে রাখলে বাঁজা হয়ে যাবে। তাই গ্রামের কোনো মানুষ হাল ছাড়ে না সহজে।
কাকা গ্রামে সকালবেলা হাঁটতে বেড়োন। আর সকলের সঙ্গে দাঁড়িয়ে মাঝে মাঝে কথা বলেন। কাকা হঠাৎ সকালে একদিন গ্রামে চুল-দাড়িওয়ালা এক সাধুবাবাকে ষষ্ঠীতলার বোল গাছের নীচে তার আসন পাততে দেখলেন। সাধুকে সকলেই বিশ্বাস করে চালটা, কলাটা এনে তার ঝুলি ভরলেন। খাবার সময় হলে খাবার পেয়ে যান। কোনো অসুবিধা তার হয় না। আর সাধুবাবা গ্রাম ছাড়েন না।
কাকার সন্দেহ হয়। খুব চেনা চেনা মনে হয়। কিন্তু স্থিতধী মানুষ তো। তাই ভাবেন, পরিবর্তনশীল এই জগতে অসম্ভব কিছু নয়। শুভ হোক সকলের। এই কথাই সকলের জন্য বলতেন। তাই বেশ খুশি মনে মদনকাকা বিকেল হলেই একবার সাধুবাবার কাছে আসতেন। বসে নিজে কথা বলতেন, আবার সাধুবাবার কথাও শুনতেন। কাকা শুধু ধর্মের কথা নয়, অন্য কথাও বলেন। ভণ্ডামি তার অসহ্য।
কাকা বলছেন, "বর্ডারগুলো একেবারে কী যে হয়েছে," বলে দীর্ঘনিশ্বাস ছাড়লেন। "গরু পাচার, মানুষ পাচার, রত্ন পাচার — কোনো আইন বা কাঁটাতার আটকাতে পারছে কি? কোটি টাকার প্রশ্ন হে। সর্ষের ভেতর ভূত থাকলে কোন ভূত দেশ ছাড়বে বলো।" খুব চিন্তায় তিনি।
সাধুবাবা বললেন, "জয় জয় জয়।" কাকা বললেন, "কার জয়?" সাধুবাবা ওইটুকুই বলেন। বাকি কথা বুঝে নেয় মানুষ। নিশ্চয় ওর কথার মধ্যে কিছু আনন্দ-আভাস আছে। সাধুবাবার ভক্তসংখ্যা বেড়েই চলেছে।
একদিন হরিনাম হলো। গ্রামের মানুষজন সকলেই মচ্ছব খেল। কাকা বলেন, "মহোৎসব থেকে মচ্ছব কথাটা এসেছে।" সুমিত বলল, "আপনি তো ক্লাস সেভেন অবধি পড়েছেন। এত খবর কী করে রাখেন?"
কাকা বলেন, "আরে, ক্লাসে পাশ না করেও বড়ো মানুষ হওয়া যায় রে মূর্খ। শুধু ভেতরের আলোটা জ্বেলে রাখবি। প্রদীপটাকে কোনো মতেই নিভতে দিলে হবে না বুঝলি।"
সাধুবাবা জোরে হাঁক দিলেন, "জয় জয় জয়।" মানে কাউকে ডাকছেন।
সাধুবাবা আর কোনো মন্দিরে বা মসজিদে যান না। তিনি বালুবাড়ির কাঁদরের ধারে আস্তানা গেড়েছেন। নিজের মূর্তি মাটি দিয়ে বানিয়েছেন। যোগাসন বিদ্যা, যৌনবিদ্যা সব কিছুতেই পারদর্শী বাবা — বলল অসীম।
"আর বলবি, বল, কাকার সামনে?" কাকা শুধোলেন। "তুই কী করে জানলি হতভাগা, ঘাটের মড়া? মার খাবি যে শিষ্যদের হাতে। সাধু আবার যৌন কারবারে কী করবে? যত সব বাজে কথা।"
কিন্তু সাধুবাবা যে কোন রসের রসিক, তার তল পাওয়া সাধারণ লোকের সাধ্যের বাইরে। সাধুবাবা দুর্বল চরিত্রের মানুষ নির্বাচন করেন প্রথমে। তারপর তাকে দিয়ে বিভিন্ন কাজ করিয়ে নেন।
একদিন ডোমপাড়ার বিজয় ওরফে বেজা এসে সাধুবাবার চরণতলে পড়ল। সাধুবাবা বললেন, "বল, কী বিপদ তোর?" বেজা বলল, "বাবা, অনেক চেষ্টা করেও সন্তান হলো না।" বাবা বললেন, "তোর চেষ্টায় ত্রুটি আছে।"
বেজা বলে, "বলুন, যত কঠিন হোক করব আমি।"
সাধুবাবা বলল, "সন্ধ্যা হলেই আমার আশ্রমে ওই পিটুলি গাছের পাতা তোর বউ দেবে আমার হাতে। কিন্তু কেউ জানবে না।"
— "তোর কথা শোনে বউ?"
বেজা বলে, "না না, একেবারেই না। শুধু ঝগড়া করে।"
সাধুবাবার মুখ হাসিতে ভরে গেল। তিনি বললেন, "সব ঠিক হয়ে যাবে। যা, যা, আমার কথা বল গিয়ে। তারপর আর মুখদর্শন করবি না।"
তারপর থেকে বেজার বউ আসে রোজ রাতে। ভোর হলেই চলে যায় ক্ষেতে। গ্রামের লোক ভাবে, জমিতে কাজ করে। প্রথম যে রাতে বেজার বউ সাধুর আশ্রমে আসে, সেই রাতে সাধু বললে, "সব শুনেছি। আমার কথা শোন। ওই খাটে বস।" সে সরল বিশ্বাসে বসেছিল। সাধু অন্ধকার ঘরে বলে, "সন্তান তো এমনি এমনি হয় না। তোকে রাতে রোজ শুতে হবে আমার সঙ্গে।"
বেজার বউ বলে, "আপনি সাধু হয়ে কী কথা বলছেন?"
— "ঠিক বলছি। যা বলছি তাই কর। তা না হলে তোর স্বামীর মৃত্যু নিশ্চিত।"
তারপর জোর করে ধর্ষণ করে সাধুবাবা বেজার বউকে। বেজার বউ আর বাধা দেয়নি। কিন্তু পরের দিন আসার জন্য সাধু জোর করেনি। তবু বেজার বউ এসেছিল। সাধু হেসে বলেছিল, "রোজ আসবি তো?"
বেজার বউ বলেছিল, "জানি না রে মিনসে। তোর কাছে যেটা পেয়েছি, উয়ার কাছে পাই লাই। তোর কাছে তাই চলে এলাম। দে এবার যত পারিস তোর মন্ত্র-তন্ত্র, ঝাড়ফুঁকের বিষ। তবু আমার সোয়ামীর যেন ক্ষতি না হয়। আর সন্তান দিবি। তা না হলে তোর মরণ আমার হাতে।"
তারপর থেকে সাধুর কারবার আরও ফুলে-ফেঁপে উঠল। বেজা দিনরাত সাধুর দেওয়া বিধি নিয়েই থাকে। তার বউ একশো দিনের কাজ করে। মুনিষ খাটে। তা থেকেই ওদের সংসার চলে। কিন্তু বছর গড়িয়ে গেলেও সন্তান হয় না। বেজা বলে, "আর যাস না সাধুর কাছে, আর আমি জঙ্গলে যাইছি ভয়ে।"
বেজার বউ বলল, "তু কুথাও যাবি না। ঘরে থাকবি। তোর কিছু হলে হেঁসো দিয়ে সাধুর গলা দোবো পেঁচিয়ে। এখনও সন্তান হলো না। তু এত বনে বনে গেলি। আমি পিটুলির পাতা দিলাম শালা ঢ্যামনাকে। দেখে লিবো একদিন, দেখিস..."
বেজা বলল, "আর যাস না সাধুর কাছে। আমাদের কপাল খারাপ।"
তারপর থেকে ওরা দুজনে আর আশ্রমমুখী হয় নাই। সাধু আর খবর নেয়নি। কারণ সে এখন আর একজনের পার করার কান্ডারি সেজেছে।
গোয়ালাপাড়ার সিধু ঘোষ চল্লিশ বছর বয়সে মরে গেছে। বিধবা বউ রমা সাধুবাবার কাছে ভালো কথা শুনতে যেত। কিন্তু গত পরশু রমাকে একা পেয়ে প্রসাদ দিল। তার সঙ্গে নিশ্চয় কিছু মেশানো ছিল — ওষুধ বা কোনো শেকড়-বাকড়। কিছুক্ষণের মধ্যেই রমা উত্তেজিত হয়ে সাধুকে জড়িয়ে ধরল। রাতের অন্ধকারে সাধু নিজের সাধ মিটিয়ে নিল।
রমা বলল, "এ তো পাপ।"
সাধু বলল, "পাপ বলে কিছু হয় না। যাও, রোজ আমার কাছে এই সময়ে আসবে।"
একবার মেয়েদের ভয় ভেঙে যাওয়ার সুযোগের অপেক্ষায় থাকত সাধু। তারপরের পথ কুসুমাস্তীর্ণ।
মদনকাকা আর আশ্রমে আসেন না। কানাঘুষোয় অনেক কথা শুনেছেন। তাই নিজের মধ্যেই নিজেকে নীরবতার আড়ালে ঢেকে রাখেন। আর এদিকে সাধু একের পর এক শিষ্য বাড়িয়ে চলে আর তেষ্টা মেটায় নশ্বর শরীরের। কিন্তু নিজের সমাধির গর্ত অজান্তে কেটেই চলে। অবিনশ্বর আত্মার কথা কেন কেউ শোনে না? আকাশে-বাতাসে দীর্ঘনিশ্বাসের মেঘছায়া নীরবে সত্যের দামামা বাজিয়ে চলে অবিরত। মানুষকুল শুনেও শোনে না কানে।
বিজয় গ্র্যাজুয়েট হয়েছিল। তারপর আবার তপশিলী। পুলিশের চাকরি একটা পেয়েছে বছর পাঁচেক হলো। বেজার বউ কিন্তু ভোলেনি বেইমানকে। একদিন ডেঙাপাড়ার মাম্পি বেজার বউকে বলল, "সাধু আমার ইজ্জত লিয়েছে।" চড়াম করে রাগ হয়ে গেল বেজার বউয়ের। এর আগে বিধবা বউ ও আরও অনেকে রিপোর্ট করেছে বেজার বউকে। ওদের গ্রামে মেয়েরা মেয়েদের কাছে সমস্ত কথা share করে।
বেজার বউ বলল, "তু বাড়ি যা। আমি দেকচি..."
চারদিকে খবরটা ছড়াতে বেশি সময় লাগল না। লোকজন মদনকাকাকে সঙ্গে করে চলে এলো বিচার করতে। মদনকাকা বললেন, "সেদিন গোড়ের ঘাটে তু আমার কথা শুনে সাধু হলি। তাও ভণ্ড সাধু।" তখন শিবু বলল, "আমি তোমাদের শিবু। আমাকে মাপ করে দাও। তোমরা আমাকে বাঁচাও কাকা।"
মদনকাকা বললেন, "তুমি এখন আমাদের নও শিবু। তুমি এখন আইনের হাতে অপরাধী শিবু।"
শিবু বলল, "আমি মেয়েটাকে বিয়ে করে সুখে রাখব।"
কাকা বলল, "তোর মতো চরিত্রহীনকে কোনো ভারতীয় কন্যা বিয়ে করবে না। সব চরিত্রহীনের মনে থাকা উচিত, এটা ভারতবর্ষ। রাত পেরোলেই পুলিশ আসবে। হয়তো আজ রাতেই হাতকড়া পরবে শিবুর হাতে।"
শিবু তাড়াতাড়ি ব্যাগ গুছিয়ে পালানোর জন্য বেজার বাড়ির পেছনের জঙ্গল দিয়ে পালাচ্ছে। আজ বিজয়ের night duty। তার বউ ধারালো হেঁসো নিয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছে সাধুকে। এবার বেজার বউ আর সাধু সামনাসামনি।
সাধু বলল, "কি রে, আমার সঙ্গে যাবি? সন্তান দোবো।"
মাথায় রক্ত উঠে গেল বেজার বউয়ের। চালিয়ে দিল ধারালো হেঁসো সাধুর গলা লক্ষ্য করে। পাঁঠার মতো ছটফট করে স্থির হয়ে গেল সাধুর শরীর। সন্তানপ্রাপ্তির আনন্দে শরীর নেচে উঠল কালীপুজোর ঢাকের তালে তালে, বেজার বউয়ের।
থানায় আজ রাতে কালীপুজো। বারবার বলা সত্ত্বেও বেজার বউ থানায় আসেনি। সব পুলিশ অফিসারকে নিজের বউ দেখানোর বড়ো সখ ছিল বেজার। তার জন্য নতুন LED শাড়িও কিনে দিয়েছে পাঁচ হাজার দিয়ে। তবু বেজার বউ বলে, "এই মাটির গন্ধ আমার জীবন।"
সবে আসর জমে উঠেছে, আর তখনই খবর এল সাধু খুন হয়েছে। বেজা ভাবছে, সাধুর কথায় পাশ করা ছেলে হয়েও বনে বনে ঘুরে বেড়িয়েছে সে। ধিক তার শিক্ষাকে। ডাক্তারবাবু বলেছেন, ওষুধে সব ঠিক হয়ে যাবে। আর দুবছরের মধ্যে তাদের ঘরে সন্তান, মা-বাবার বুক আলো করে আসবে।
কিন্তু সাধু খুন হওয়াতে একরাশ বৃষ্টির ছাট তার হৃদয় ভিজিয়ে দিল। এখন খুনের তদন্তের দায়িত্ব পড়েছে তার উপর। সে এখানকার লোকাল ছেলে। সব কিছুই তার নখদর্পণে। এখানকার প্রকৃতি সহজ-সরল বেজার সঙ্গে কথা বলে। লাশের কাছে দলবল নিয়ে যেতে যেতে বিজয়বাবুর চোখের সামনে তার বউয়ের মুখের আদলে একটা মুখ আলো-হাসি মাখানো চোখে ভেসে উঠল গ্রামের শান্ত সবুজ জুড়ে...
বিজয় যখন জঙ্গলে লাশ দেখতে গেল, তখন নিজের বাড়িতে একবার টুকি মেরে দেখল। কাউকে দেখা গেল না। পাশের বাড়িতে জিজ্ঞাসা করেও বউয়ের খোঁজ পেল না। তারপর বাধ্য হয়ে জঙ্গলে গেল।
খুন করার পরেই রক্তমাখা হেঁসো নিয়ে বিজয়ের বউ থানায় এসে হাজির। সে এসেই বলল, "আমি সাধুকে খুন করেছি।" পাড়ার মেয়ে-বউ সকলে খবর পেয়ে থানায় এসে হাজির। সবাই সাধুর নামে ধর্ষণের অভিযোগ করল। অফিসার গ্রেপ্তার করলেন বিজয়ের স্ত্রীকে। তারপর বললেন, "যা হবে, কোর্টে হবে। আপনারা সাক্ষী হিসাবে সকলে যাবেন।"
মদনকাকা বলছেন, "এই কেসে কিছু হবে না রে। ধর্ষকের কোনো মতেই বেঁচে থাকার অধিকার নেই। তবে নিজের হাতে আইন তুলে নিবি না। আইনে ভরসা রাখবি। তার হাত অনেক লম্বা।"
কিছু উঠতি ছেলে বলে উঠল, "শালাকে খুন করে ভালোই করেছে বেজার বউ।"
কাকা বললেন, "ঠিক বলেছ। কাল আমরা সকলেই কোর্টে যাব, বুঝলে হে।" সবাই রাজি হলো।
কয়েক মাসের মধ্যেই শোনা গেল বেজার বউয়ের দুবছরের জেল হয়েছে। কাকা বললেন, "যারা অপরের জন্য জীবনের বাজি রাখে, সমাজকে সুস্থ রাখে, তারাই হলো প্রকৃত সাধু।"
পাড়ার জটাই বাগ্দি বলল, "বেজার বউ ওই খচ্চরটাকে বলি দিল বলেই গ্রামের মা-বোনের ইজ্জত বাঁচল। তা না হলি ওর কি দায় পড়েছে জেল খাটার?"
কাকা বললেন, "ঠিক বলেছে জটাই। সবাইকে বাঁচাতে গিয়েই ওর এই অবস্থা। স্বাধীনতার যুদ্ধে র মাতঙ্গিনী হাজরা, আমাদের এই বেজার বউ। ও আমার বয়সে ছোটো হলেও আজকে আমার মা বলে মন হচে রে।" ধুতির খুঁট দিয়ে ঝাপসা চশমার কাঁচটা মুছে নিলেন কাকা।
কাকা সবাইকে বলছেন, "ওদের জন্যে আমরা প্রার্থনা করি এসো। একটা সন্তান ওদের ঘর আলো করে আসুক। আর তাছাড়া আমাকে বলেছে, বিজয় শহরে বউমাকে নিয়ে গিয়ে ডাক্তার দেখিয়ে এনেছিল। ডাক্তারবাবু আশ্বাস দিয়েছেন। ওষুধও প্রয়োজনমতো দিয়েছেন। স্বামী-স্ত্রীর স্বাভাবিক সম্পর্কের সাথে সাথে ওষুধ খাবার পরামর্শ দিয়েছেন। কোনো cyst বা অস্বাভাবিক ত্রুটি কিছুই নেই। Ultrasonography করিয়েছে শহরের ভালো ডাক্তারের কাছে। বিখ্যাত ডাক্তার আর. এন. মণ্ডল বলেছেন, চার বছরের মধ্যেই সন্তান হবে। এর অন্যথা হবে না।"
কাকা বলেন, "ডাক্তার হচ্ছে মর্ত্যের ভগবান। তারা যা বলেন, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তাই হয়।"
জেলে থাকলেও বিজয় ডাক্তারের ওষুধ দিয়ে আসত প্রতি মাসে। নিজেও খেত। দেখতে দেখতে দুবছর পার হয়ে গেল। আবার জীবনচক্র চলতে লাগল। এবার বিজয় তার বউকে আর মাঠে কাজ করতে যেতে দেয় না। শুধু অফিস যাওয়ার সময় রান্না করত। আর সারাদিন সে পাড়ার কার কী সুবিধা-অসুবিধা দেখত আর তার সমাধান করে দিত চটজলদি।
পাড়ার সব মহিলা একসাথে টাকা জোগাড় করে বিজয়ের বউকে একটা সুন্দর শাড়ি কিনে দিয়েছে। গরিবলোকের অকৃত্রিম ভালোবাসা। তার স্বামী এখন চাকরি পেয়েছে। সরকারি পুলিশের চাকরি। তাদের এখন ধনী বলা যায়। কিন্তু বেজার বউ মাম্পিদের বলে, "খেপেছিস, আমি কি বসে থাকতে পারি? যতই বলুক তোর দাদা, আমি মাটি আর গোবরের স্পর্শ ভুলতে পারব না। আমি যতদিন বাঁচব, এই মাটি ছুঁয়েই থাকব।" এই বলে সে উঠোনের একমুঠো মাটি মাথায় বুলিয়ে নেয়।
মদনকাকা একটা মিষ্টির প্যাকেট হাতে করে সন্ধ্যেবেলায় গেলেন বিজয়ের বাড়ি। তার বাড়ি ঢোকার আগে কাকা ব্যাগটা নামিয়ে জোড়হাতে নমস্কার জানালেন তার মনোজগতের মনমাতানো মহান সাধু মানুষকে, যাদের খোঁজ কাকা আজীবন করে এসেছেন।
বড়দা গল্প বলে চোখ মুছলেন। তারপর আবার শুরু করলেন কাকার বাকি জীবনের কাহিনি। মদনকাকাকে বড়দা নিজের আত্মীয় মনে করতেন। তাই নিজের জীবনের কথা তাকে বলতেন। আজও বলছেন, "বাবার চাকরিসূত্রে লিলুয়া শহরে জীবনের তিরিশ বছর কেটেছে। কেতুগ্রাম থানার বড় পুরুলিয়া গ্রামে আমার চোদ্দ পুরুষের ভিটে। আমরা তিন ভাই মামার বাড়িতে জন্মেছি। আর ছোটো ভাই পুরুলেতে জন্মগ্রহণ করেছে। তাই জন্মস্থান আমার আহমদপুরে নেমে জুঁইতা গ্রামে।"
"বাবা আমাদের তিন ভাইকে ও মাকে নিয়ে লিলুয়া এলেন। আমরা বিদ্যুতের আলো দেখিনি। লিলুয়া গিয়ে হঠাৎ বিদ্যুতের আলো দেখে চমকে গেলাম। কোথা থেকে এত আলো এলো! আমাদের চোখ ঝলসে যাওয়ার অবস্থা। মা আমাদের বললেন, একে electric আলো বলে। ওই দেখ ওপরে, bulb লাগানো।"
স্কুলে যাওয়ার অভ্যাস গ্রামে থাকতেই হয়েছিল। কেউ গাঁয়ের মাস্টারমশাই আমাদের পড়াতেন। পরের দিন আমরা দুই ভাই স্কুলে ভর্তি হতে গেলাম। বড়দা গ্রামে কাকার কাছে, আর ছোটো ভাই বাবু একদম ছোটো। স্কুলে মীরা দিদিমণি সহজপাঠের প্রথম পাতা খুলে বললেন, "এটা কী?" আমি বললাম, "অয়ে অজগর আসছে ধেয়ে।" আবার বই বন্ধ করলেন। তারপর আবার ওই পাতাটা খুলে বললেন, "এটা কী?" আমি ভাবলাম, আমি বললাম এখনই। চুপ করে আছি। ঘাবড়ে গেছি। দিদি বাবাকে বললেন, "এবছর ওকে ভর্তি করা যাবে না।" ছোড়দা ভর্তি হয়ে গেল।
তারপর বাসাবাড়িতে জীবনযাপন। সুবিধা-অসুবিধার মাঝে বড়ো হতে লাগলাম। আমাদের খেলার সঙ্গী ছিল হারু, মোহিনী, অশ্বিনী, গৌতম, গোরা, আশু, ভুট্টা, ছানু, বীথি, গায়ত্রী, জনা, গীতা, অশোকা, পেটুক, বিশু, বিপুল, অসীম ও আরও অনেক বন্ধু। ধীরে ধীরে আমরা বড়ো হয়ে টি. আর. জি. আর. খেমকা হাই স্কুলে ভর্তি হলাম। তখন লাইনের পাশ দিয়ে যাওয়া-আসা করার রাস্তা ছিল না। লাইনের কাঠের পাটাতনের উপর দিয়ে হেঁটে যেতাম। কতজন ট্রেনে কাটা পড়ে যেত, তার হিসাব নেই। তারপর ওয়াগন ব্রেকাররা মালগাড়ি এলেই চুরি করত রেলের সম্পত্তি। কঠিন পরিস্থিতি সামলে চলত আমাদের লেখাপড়া। এখন পরিস্থিতি অনেক ভালো। পাশে রাস্তা আছে। ওয়াগন ব্রেকারদের অত্যাচার নেই।
মনে আছে ক্লাস সেভেন অবধি লিলুয়ায় পড়েছি। তারপর গ্রামে কাকাবাবু মরে গেলেন অল্প বয়সে। বাবা অবসর নিলেন চাকরি থেকে। মেজভাই রয়ে গেল লিলুয়ায়। বাবা, মা ও আমাদের দুই ভাইকে নিয়ে এলেন বড় পুরুলিয়া গ্রামে। গ্রামে কাকিমা ও দুই বোন — রত্না ও স্বপ্না। আমরা চারজন। মোট সাতজন সদস্য। শুরু হলো গ্রামের জীবন।
আবার বিল্বেশ্বর হাই স্কুলে ভর্তি হতে গেলাম বাবার সঙ্গে। ভর্তির পরীক্ষা হলো। হেডমাস্টারমশাই বললেন, "বাঃ, ভালো পত্রলিখন করেছে। বিজয়া প্রণামের আগে চন্দ্রবিন্দু দিয়েছে। ক'জনে জানে!" আমি প্রণাম করলাম স্যারকে। ভর্তি হয়ে গেলাম।
তারপর থেকেই আমার কাছে তোমার যাওয়া-আসা শুরু হলো, বললেন কাকা। "তুমি অন্য গ্রামের ছেলে হলেও আমার কাছে মাসে একবার আসতে। আমি তোমাকে লাঠিখেলা, ব্যায়াম শেখাতাম তরুণ বয়সে। তুমি হলে যোগ্য ছাত্র। তাই আজও বৃদ্ধ বয়সে তুমি আমার খোঁজ নাও।"
বড়দা জানতেন, মদনকাকা বিয়ে করেননি। আজীবন অকৃতদার। মানুষের মঙ্গলচিন্তাই তার ধ্যান, জ্ঞান, সাধনা। ভণ্ডামি ছিল না কোনোদিন। গেরুয়া রঙের হৃদয় আর সাদা বিশ্বাসে ভর করে মানুষের মাঝেই তার ঈশ্বরদর্শন। শেষ বয়সে আশেপাশের গ্রামে চাঁদা তুলে একটি লঙ্গরখানা বানিয়েছেন। সেখানে অনেক অভুক্ত মানুষ দুমুঠো খেয়ে দুহাতে প্রণাম করে সিদ্ধপুরুষ মদনকাকাকে।
লেখক কাটোয়া শহরের বাসিন্দা — কবিতা,গল্প, উপন্যাস লিখতে ভালোবাসেন। ছোটবেলায় স্কুলে পড়তে গল্প দিয়ে লেখা শুরু — বর্তমানে আরও আনন্দ, সানন্দা ব্লগ কবি সম্মেলন, কবিতাপাক্ষিক, আরম্ভ, ধুলামন্দির, অক্ষর ওয়েব, দৈনিক বজ্রকন্ঠ, দৈনিক সংবাদ, তথ্যকেন্দ্র, যুগশঙ্খ, আবহমান, অপরজন, কৃত্তিবাসী ওয়েব, ম্যাজিক ল্যাম্প, জয়ঢাক, অংশুমালী, প্রভাতফেরী, দৈনিক গতি প্রভৃতি পত্রিকায় নিয়মিত লেখালেখি করেন। বিভিন্ন প্রকাশনী থেকে অন্তরে আলো জ্বলে, শিশিরের ছৌ (কবিতা সংকলন), তিন-এ নেত্র সহ আরও অনেকগুলি বই প্রকাশিত হয়েছে।
আপনার ভোটেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
বিস্তারিত নিয়ম
প্রতিটি কলম প্রতিক্রিয়াই একবার করে দেওয়া যাবে, তবে প্রয়োজনে সেই প্রতিক্রিয়া পরিবর্তন করা সম্ভব। কোনো লেখায় একটি কলম প্রতিক্রিয়া দেওয়ার পর, একই মাসে অন্য কোনো লেখায় সেই একই কলম প্রতিক্রিয়া নির্বাচন করলে আগের প্রতিক্রিয়াটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে, রয়ে যাবে সর্বশেষ প্রতিক্রিয়াটি। এই প্রতিক্রিয়াগুলির মাধ্যমেই নির্বাচিত হবেন ‘মাসের সেরা কলম’ সম্মানের ‘পাঠকের প্রতিক্রিয়া’ পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক–লেখিকারা।