ভোর পাঁচটার অ্যালার্ম বেজে বেজে থেমে গেছে, ঘুম ভেঙে গেলেও বিছানা ছেড়ে উঠতে ইচ্ছে করে না দিশার। একরাশ মন খারাপ আজ গ্রাস করেছে তার সকালটা। নতুন ভোরের প্রতি কোনো আগ্রহই তার নেই — পাখির কলকাকলিতে আজকাল আর আনন্দ পায় না সে। তার জীবনের রঙটা দিনদিন বদলাতে বদলাতে ধূসর হয়ে গেছে। জীবনের তেত্রিশটা বছর কাটিয়ে দিশা আজ ক্লান্ত। নিজের জীবনের লড়াই লড়তে লড়তে আজ সে একজন আহত সৈনিক, যার শরীরটা রয়েছে, কিন্তু মনটা অনেক দিন আগেই মারা গিয়েছে কাছের মানুষদের রোজকার অপমানে। একসময় নামী মাল্টি-ন্যাশনাল কোম্পানিতে এইচ. আর ছিল দিশা, কিন্তু এখন সম্পূর্ণরূপে গৃহবধূ। অয়ন মিত্রের স্ত্রী সে — তার চাকরি করার অধিকার তো দূর, নিজের মতো বাঁচবার অধিকারটুকুও নেই।
দিশার ছোটবেলা কেটেছে জামশেদপুরে, বারো বছর বয়সে মায়ের হাত ধরে কলকাতায় আসা। ওই বয়সে বাবা-মায়ের বিচ্ছেদের পর যখন মামার বাড়িতে চলে আসে দিশা, মনে মনে খুব খুশিই হয়েছিল। তার মনে হয়েছিল, চোখের সামনে রোজ তার মাকে পড়ে পড়ে মার খেতে দেখতে হবে না আর। রোজ রাতে কোলিয়ারি থেকে বাড়ি ফেরার পর তার বাবা যে ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করতেন, সেটা ভাবলে আজও গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে তার। বড় মামা অত্যন্ত ভালোমানুষ, তিনিই সমস্ত দায়িত্ব নিয়েছিলেন বোন আর ভাগ্নিকে ভালো রাখার। কখনো অভাবের মুখ দেখেনি দিশা, কিন্তু ঘুমিয়ে পড়লেই বাবার সেই বিভৎস রূপটা তার মনে ভিড় করে আসত, অসহ্য কষ্ট হত মাথায়। এইভাবেই দিন কাটছিল। সমস্যা হয়ে দাঁড়াল তার মামাতো দাদা ঋষির অকালপক্বতা আর বিকৃত মানসিকতা। দিনের পর দিন মামার বাড়ির চিলেকোঠার ঘরে শারীরিক লালসার শিকার হতে হয়েছে তাকে, কিন্তু দুটো ঠোঁট ফাঁক করতে পারেনি মাথার ওপর ছাদ হারানোর ভয়ে। বারবার মাকে বলা সত্ত্বেও তাকে চুপ করিয়ে দিয়েছেন রীনা দেবী, শুধুমাত্র লোকলজ্জার ভয়ে নয়, সঙ্গে ছিল দিশাকে মানুষ করার জেদও।
আজ মামার বাড়িতে থাকতে না পারলে তার বড় হয়ে ওঠাটা আরও কঠিন হয়ে যেত ঠিকই, কিন্তু ওইভাবে দিনের পর দিন যৌন লালসার শিকার হয়ে আত্মসম্মানহানি হত না। এই ঘটনার ফলে মায়ের সঙ্গেও একটা দূরত্ব তৈরি হয়েছিল দিশার। কিন্তু কিশোরী মনে যে আঘাত লেগেছিল দিশার, তা দিনে দিনে একটা দগদগে ক্ষতে পরিণত হয়েছিল — নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিল সে।
"দিশা! দিশা! আর কত বেলা অবধি ঘুমোবে, আজ কি আর চাটা পাব না? দিশা!" শাশুড়ি মায়ের ডাকে চমক ভাঙে দিশার। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে সত্যিই অনেকটা দেরি হয়ে গেছে, এক্ষুনি না গেলে আর রক্ষা নেই। অতীতের ভাবনা বন্ধ করে আড়ামোড়া ভেঙে উঠে পড়ে দিশা।
চা করতে করতে আবার ভাবুক হয়ে পড়ে সে। দুধ উথলে উঠতে দেখে আবার শাশুড়ি মায়ের ধমক খায় সে, "কি হয়েছে তোমার? সবসময় মন উড়ুউড়ু, কোন কাজটা যদি ঠিক করে করতে পারো। যাও, বাবাকে গিয়ে চাটা দিয়ে আমায় উদ্ধার করো।" এই বলে দুমদুম করে পা ফেলে তিনি রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে যান। দিশার চোখে জল এসে যায় — এই বাড়িতে তার দিন শুরু হয় এইভাবেই। পাঁচ বছরে আজও শাশুড়ি মায়ের মন জয় করতে পারেনি সে। চোখের জলটা মুছে চা নিয়ে যায় বাইরের ঘরে। গিয়ে দেখে তার শ্বশুর, শাশুড়ি আর অয়ন তিনজনেই রয়েছে সেখানে।
এই অবধি শুনে দিশা আর সহ্য করতে না পেরে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। আজ আর কান্নাও পাচ্ছে না তার। ভালোবেসে বিয়ে করেছিল অয়নকে, কিন্তু আজ মনে হচ্ছে, সেই ভালোবাসাটা মনে হয় একতরফাই ছিল। দিশার মতো স্বাধীনচেতা অথচ অতীতের ভারে নুয়ে পড়া একটা মেয়েকে হয়তো একান্ত নিজের দাসীর মতোই পেতে চেয়েছিল অয়ন। হয়তো তার কাছে দিশার মনের খবর নেওয়ার থেকে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল নিজের শারীরিক চাহিদা মেটানো — বা হয়তো ছুঁড়ে ফেলে দেওয়ার আগে পর্যন্ত নিংড়ে শুষে নিতে চেয়েছিল দিশার প্রাণশক্তি! জানে না দিশা। আজ বারবার নিজেকে ভীষণ অদরকারি, অকর্মণ্য মনে হচ্ছে তার — নিতান্তই অপ্রয়োজনীয় একজন, যার মানসম্মান কিচ্ছু নেই, যে শুধুই অন্যদের চাহিদা মেটানোর জন্য জন্মেছে। আজ বড্ড একা লাগছে তার, মনে হচ্ছে কেউ নেই তার চারপাশে। যে অয়নকে ভালোবেসে সে বিয়ে করেছিল, আজ তাকে বড় অচেনা লাগে।
আজ বড্ড মনে পড়ছে জামশেদপুরে তাদের বাড়ির সামনের আমগাছটার কথা, কত পাখি বাসা বাঁধত সেই গাছে, কিন্তু দিশা কেন বাসা বাঁধতে পারল না? দিশা কেন পারল না তার ভালোবাসা দিয়ে সবাইকে আপন করে নিয়ে সংসার করতে, কোনো উত্তর নেই তার কাছে। এসব ভাবতে ভাবতে রান্না শেষ করল দিশা। হঠাৎ তার কানে এল শাশুড়ি মা কাউকে বলছেন, "আর বোলো না, আমার ছেলের জীবনটা একেবারে শেষ করে দিল ওই মেয়েটা। বাবুর ঘাড় থেকে নামাতে পারলে বাঁচি। পাঁচ বছর হয়ে গেল, এখনও ছেলে-পুলে হল না, ছেলেটা আমার মুখ শুকনো করে ঘুরে বেড়ায়। কত চিকিৎসা করানোর পেছনে পয়সা খরচ করে, কিন্তু বৌকে একটা কথাও বলে না।" এত অবধি শুনে আর নিতে পারল না দিশা, নিজের ঘরে চলে এল। এত অভিযোগ, এত অপমান, এত দোষারোপ সত্যিই আর নিতে পারছে না দিশা। কী আছে তার জীবনে! আবার অতীতে ডুব দেয় দিশা।
অতীত মানেই তো একটা অসহ্য যন্ত্রণা, একটা দাঁত-নখ বের করা হিংস্র পশু, যার বাইরেটা মানুষের মতো হলেও আসল চেহারাটা একটা বিষধর সাপের মতো। দিশার কৈশোর-যৌবন নষ্ট করে দিয়েছে যে মানুষরূপী দানব, যার বিকৃত লালসা চরিতার্থ করতে হয়েছে দিশাকে মুখ বন্ধ করে, মাথার ওপর ছাদ হারানোর ভয়ে। এই একটা কারণেই মায়ের সঙ্গে তার এত দূরত্ব, আজও মায়ের ওপর অভিমান বুকে চেপে রেখেছে সে। বিয়ের পর ওই বাড়ি ছেড়ে আসতে তার একটুও কষ্ট হয়নি, উল্টে সে যেন হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছিল। আজও গভীর রাতে সেই পাশবিকতার দুঃস্বপ্ন ভিড় করে আসে তার স্বপ্নে, আজও সে শিউরে ওঠে ওই দিনগুলোর কথা ভাবলে।
অয়নকে দিশা ভালোবেসেছিল কলেজে, তারপর দুজনে চাকরি পাওয়ার পর বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেয়। দিশার মা কোনো আপত্তি করেননি, কিন্তু আপত্তি ছিল অয়নের বাড়ি থেকে। অনেক আলাপ-আলোচনা, অনেক বাধা পেরিয়ে বিয়েটা হয়। কিন্তু ইদানীং রাত হলেই অয়ন এখন যেন এক মানুষ, সে নিজের মধ্যেই থাকে না। আগের দিন রাতের ঘটনার বিভৎসতা কিছুতেই ভুলতে পারছে না দিশা। দিশার শরীরটা খারাপ থাকায় সে অয়নকে রীতিমতো কাকুতি-মিনতি করে তাকে রেহাই দেওয়ার জন্য, কিন্তু অয়ন দিশার ইচ্ছের বিরুদ্ধে জোর করেই তার সঙ্গে সঙ্গমে লিপ্ত হয়, এবং স্বেচ্ছায় না আসার জন্য রীতিমতো অত্যাচারিত হয় সে — শারীরিক, মানসিক দুইভাবেই রক্তাক্ত হয় দিশা।
নিজেকে আয়নায় দেখে ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নিল দিশা। নিজেকে ভীষণ সহজলভ্য মনে হচ্ছে তার। মামার বাড়িতে ঋষির ভোগ্যপণ্য ছিল সে, কিন্তু ভাবতে পারেনি অয়নও তাকে ভোগ্যপণ্য হিসেবেই দেখবে। কাল অয়নের চোখে ভালোবাসার লেশমাত্র ছিল না, ছিল শুধুমাত্র লালসা।
আর না, আর সে সহ্য করতে পারবে না এই অপমান। তার আত্মসম্মান তলানিতে এসে ঠেকেছে, তার না আছে কোনো শুভাকাঙ্ক্ষী, না আছে কেউ নিজের। এমনকি নিজের মাকেও বড় দূরের মনে হয়। বেঁচে থাকার জন্য আজ আর কোনো কারণ নেই তার। শুধু একটাই আফসোস রয়ে গেল তার — এ জীবনে আর মা হওয়া হল না। রোজ রোজ একটু একটু করে মরতে মরতে সে ক্লান্ত। এই ঘৃণ্য জীবন থেকে বাঁচতে হলে তাকে মরতে হবে — একমাত্র আত্মহত্যাই তাকে বাঁচিয়ে দিতে পারে তিলে তিলে মরে যাওয়ার হাত থেকে।
বেলা বারোটার নাগাদ বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ে দিশা। সামনেই রবীন্দ্র সরোবর মেট্রো স্টেশন। পরনে তার খুব পছন্দের একটা গাঢ় নীল ঢাকাই। নিজের মোবাইল ফোনটা বাড়িতেই রেখে এসেছে সে, শুধু সিম কার্ডটা ফেলে দিয়েছে। স্টেশনে পৌঁছে দাঁড়িয়ে আছে সে। তার মাথায় আর কিছুই নেই, খালি একটাই লক্ষ্য — নিজেকে শেষ করা। আজ ভালো-মন্দ, লোকলজ্জার ভয় নেই তার, আর কোনো বন্ধন নেই তার, আর কোনো সম্পর্কের জোড়াতালি নেই, আছে শুধু একরাশ বিদ্বেষ। নিজের প্রতি ঘৃণা, নিজের ভাগ্যের প্রতি একরাশ অভিযোগ আর নিজের মায়ের ওপর একবুক অভিমান — আজ আর কারও কথাই মনে পড়ছে না দিশার। সে শুধু জানে, আজ তাকে মরতেই হবে, আজ তার জীবনের শেষ দিন।
দূর থেকে দেখল ট্রেনের আলো দেখা যাচ্ছে। ধীর পায়ে এগিয়ে আসে দিশা। ওই তো আসছে তার লক্ষ্য। পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল সে, জোর হচ্ছে হলদে আলোটা, আরও একটু এগিয়ে গেল সে, বেশ কাছে এসে গেছে আলোটা, চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছে আলোয় — আর বেশি নয় দূরত্ব, আর এক পা এগোলেই সে পৌঁছে যাবে লক্ষ্যে। পা বাড়িয়ে দিল দিশা, ঝাঁপিয়ে পড়ল মৃত্যুর পথে — হু হু করে বেরিয়ে গেল ট্রেনটা।
পৌঁছে গেল দিশা এক অন্য জগতে, যেখানে আলোয় আলো, মেঘের গায়ে রামধনুর সাতটি রং ফুটে উঠেছে, সেখানে কোনো হলাহল নেই, মারধর নেই, খারাপ স্বপ্ন নেই, মন খারাপ নেই — শুধু আছে শান্তি। দূর থেকে দেখতে পেল দিশা — অয়ন খুঁজছে দিশাকে, বাড়িতে দেখতে না পেয়ে হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছে তাকে। অয়নের রোদে-পোড়া ক্লান্ত মুখটা দেখে বড় মায়া হল তার। অয়নকে ছুঁতে চেষ্টা করল, কিন্তু কই, পারছে না সে ছুঁতে। অয়ন নিজেকেই দোষারোপ করছে তার আচমকা চলে যাওয়ার জন্য। আজ অনেক দিন পর পুরোনো অয়নকে দেখতে পেল দিশা — কিন্তু সে যে ধরাছোঁয়ার বাইরে আজ।
অনেক দিন পর মাকেও দেখল আজ দিশা। একি চেহারা হয়েছে মায়ের — কঙ্কালসার। মাকে দেখে আজ কত বয়স্ক লাগছে। মায়ের কাছে এগিয়ে গিয়ে "মা" বলে ডাকল সে, কিন্তু তিনি শুনতে পেলেন না। আজ তার নিজের ওপর ভীষণ রাগ হচ্ছে। এত দিন কেন লক্ষ্য করেনি সে মায়ের এই অবস্থা! শুধুমাত্র নিজের অভিমান-অভিযোগকেই প্রাধান্য দিয়ে এসেছে এযাবৎকাল, খুব বড় অন্যায় করে ফেলেছে সে। আজ কে দেখবে তার মাকে? চোখটা জ্বালা করে ওঠে তার, মাকে বড্ড ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছে হয়, মনে হয় ভীষণ হঠকারিতা করে ফেলেছে সে। মায়ের এই কান্না, মায়ের মুখ বুজে সমস্ত সহ্য করা — সবটাই যে তার জন্য। মাকে বুঝতে বড় দেরি করে ফেলেছে দিশা, ভীষণ স্বার্থপরের মতো কাজ করেছে সে এই আত্মহনন করে।
দিশা দেখতে পেল তার শাশুড়ি মাও যেন শোকস্তব্ধ। তিনি শুধু বিলাপ করে চলেছেন যে এই ঘটনার জন্য তিনিই দায়ী, ছেলের ভালো করতে গিয়ে তিনি খারাপ করে ফেলেছেন। দূর থেকে এসব দেখে মনটা বড় ভারী হয়ে গেল দিশার। তাহলে কি আত্মহত্যা করে সে ভুল করল? হঠাৎ শাড়ির আঁচলে টান, "মা! মা! এখানে যে ভীষণ আলো, মা, আলোর তেজে যে আমার কষ্ট হচ্ছে, মা। আমায় কোলে নাও, মা, একবারটি কোলে নাও।" পেছনে ফিরে দেখে একটা ফুটফুটে বাচ্চা, ঠিক যেন তার ছোটবেলা। অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করে দিশা, "কে তুমি? এখানে এলে কী করে?" বাচ্চাটি হাত-পা নেড়ে বলে, "আমি তো তোমার সাথেই এলাম, মা। আমি তো তোমার কলি, যার জন্য তুমি এত দিন অপেক্ষা করছিলে। আমায় হারিয়ে যেতে দিও না, মা, আমায় শক্ত করে ধরে রাখো।" "কলি! কলি!" বলে চিৎকার করে ওঠে দিশা।
"এই তো মিসেস মিত্র, উঠবেন না, শুয়ে থাকুন," বলে ওঠে নার্সের পোশাক পরা একটি মেয়ে। কিছুই বুঝতে পারে না দিশা। চারদিকে তাকিয়ে দেখে হাসপাতালের বেডে শুয়ে আছে সে, চারপাশে রয়েছে অজস্র যন্ত্রপাতি, ঘরটায় কড়া ফিনাইলের গন্ধ। পাশ ফিরতেই দেখে অয়ন বসে রয়েছে চিন্তিত মুখে, সঙ্গে একজন অচেনা মহিলা। তার মাথা কাজ করছে না। মহিলা নিজেই উঠে আসেন, দিশার হাতটা ধরে বলেন, "আমায় আপনি চিনবেন না, আমি সুমেধা, অয়ন আমার অফিস-কলিগ, সেই সূত্রেই আপনাকে চিনি।" দিশা এখনও অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। সুমেধা বলে, "কি করতে যাচ্ছিলেন আপনি? আর এক সেকেন্ড এদিক-ওদিক হলে সব শেষ হয়ে যেত। আপনি ঝাঁপ দেওয়ার আগেই অজ্ঞান হয়ে যান, তাই এ যাত্রা প্রাণে বেঁচে গেলেন। লোকজনের ভিড় ঠেলে আপনাকে দেখে আমিই অয়নকে খবর দিই। নিজের কথা না হয় নাই ভাবলেন, কিন্তু আরেকটা প্রাণ, যেটা আপনার মধ্যে বেড়ে উঠছে, তার কথাটাও ভাবলেন না?"
সুমেধা ওঠার জন্য পা বাড়ায়। দিশা পেছনে ডাকে, বলে, "সুমেধা, আপনি আমায় সন্তানহত্যার অন্যায়ের হাত থেকে বাঁচালেন আজ। আপনি আমায় নতুন জীবন দিলেন, আপনার এই ঋণ আমি আজীবন মাথায় করে রাখব।"
সুমেধা এগিয়ে এসে দিশার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন, "বাইরে তোমার মা অপেক্ষা করছে, ওনাকে ডেকে দিচ্ছি। তুমি আরাম করো, আর বাই দ্য ওয়ে, কনগ্র্যাচুলেশনস।" এই বলে বেরিয়ে যায় সুমেধা।
অয়ন এগিয়ে আসে কথা বলতে, এমন সময় দিশার মা রীনা দেবী ঘরে ঢোকেন। মাকে দেখে এত কষ্ট আগে কখনো হয়নি তার। রীনা এগিয়ে এসে মেয়েকে জড়িয়ে ধরেন, বলেন, "দিশা মা আমার, তুই কি করতে যাচ্ছিলিস মা গো? তোর কিছু হয়ে গেলে আমি কী নিয়ে থাকতাম, সোনা? এত অভিমান তোর যে, আমার কাছে না গিয়ে এত বড় শাস্তি দিতে যাচ্ছিলিস আমায়? কী এমন হয়েছিল যে এইরকম একটা সিদ্ধান্ত নিলি তুই?" এই বলে জিজ্ঞাসু দৃষ্টি নিয়ে তাকান মেয়ের দিকে।
দিশা কিছু বলে না, অয়নের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে। ওই দৃষ্টি অয়ন সহ্য করতে না পেরে মাথা নামিয়ে নেয়।
অয়নের দিকে তাকিয়েই দিশা বলতে শুরু করে, "মা, আমি মরীচিকার পেছনে দৌড়োচ্ছিলাম, কিন্তু মা, পৌঁছে দেখলাম মরীচিকা যে দূর থেকেই দেখতে ভালো লাগে, সামনে থেকে যে একটা রুক্ষ, শুষ্ক মরুভূমি ছাড়া আর কিছুই নয়, মা। যে মানুষটাকে ভালোবেসে স্বেচ্ছায় তোমায় ছেড়ে এসেছিলাম, যে মানুষটার ভালোবাসার টানে নিজের পরিচয়, নিজের কাজ সব ছেড়ে দিয়ে শুধুমাত্র তার ঘরনি হয়ে তার সংসার সামলানোর চেষ্টা করেছিলাম, তারই ভয়ঙ্কর রূপ আমার সামনে এসেছে, মা। তার ভালোমানুষের মুখোশ খুলে গিয়ে আমার সামনে বেরিয়ে এসেছে এক কামার্ত, বিকৃতমনা এক পশু, যে তার বিবাহিত স্ত্রীর ওপর শারীরিক জোর খাটাতেও পিছপা হয় না।"
অয়ন চিৎকার করে ওঠে, "দিশা, আর নয়, প্লিজ, তুমি আমায় ক্ষমা করে দাও, আমি পাপ করেছি। কিন্তু আমি নিজেকে শুধরে নেব, আর কোনো দিন তোমার গায়ে হাত তুলব না। আমায় মাফ করো, দিশা। আমার মায়ের হয়েও আমি ক্ষমা চাইছি। আজ আমাদের কত আনন্দের দিন, এত দিন পর আমরা বাবা-মা হতে চলেছি।" এই বলে দিশার হাতটা ধরে অয়ন। দিশা হাত ছাড়িয়ে নেয়, বলে, "অয়ন, আর না। গত পাঁচ বছর আমি অনেক সহ্য করেছি, কিন্তু কোনো দিন টুঁ শব্দটি করিনি। আজ আর চুপ করে থাকতে পারব না।"
এমন সময় ড. রায় ঘরে ঢোকেন। "মিসেস মিত্র, কেমন লাগছে এখন? আর এখন কিন্তু খুব সাবধানে থাকতে হবে আপনাকে, সবসময় মন ভালো রাখবেন, অল দ্য বেস্ট!" ড. রায় এগিয়ে আসেন দিশার দিকে। দিশা বলে, "ভালো আছি, ড. রায়, আপনার কথা নিশ্চয়ই শুনব, আমি ভালো থাকব, আমার সন্তানের জন্য ভালো থাকব।" ড. রায় দিশাকে ডিসচার্জ করে দিয়ে চলে গেলেন।
অয়ন বলল, "চলো, দিশা, তৈরি হয়ে নাও, বাড়ি ফিরতে হবে," এই বলে হাত ধরতে যায় দিশার। দিশা দৃঢ় কণ্ঠে জানায়, "অয়ন, আমি তোমাদের ক্ষমা করলাম। কিন্তু তোমার সঙ্গে যেতে পারব না। আজ মৃত্যুমুখ থেকে ফিরে এসেছি আমি, জীবন আমায় দ্বিতীয় সুযোগ দিয়েছে। দিশা মিত্রের মৃত্যু হয়েছে, আর মৃত্যুর পর যে নতুন করে জীবন ফিরে পেয়েছে, সে দিশারী সেন, রীনা সেনের একমাত্র মেয়ে। মৃত্যু-পরবর্তী এই জীবনে আমি কোনো অয়ন বা ঋষিকে আসতে দেব না। আমি আমার সন্তানকে তার মায়ের পরিচয়ে মাথা উঁচু করে বাঁচতে শেখাব, আর আমার সঙ্গে সসম্মানে থাকবে চিরকাল লোকের দয়ায় বেঁচে থাকা আমার মা। তোমার আর আমার পথ অনেক আগেই আলাদা হয়ে গেছে, যে মুহূর্তে তুমি আমার ওপর শারীরিক হেনস্থা করেছ। ঠিক সময়ে তোমার কাছে ডিভোর্সের কাগজ পৌঁছে যাবে। মা, চলো।" এই বলে উঠে দাঁড়ায় দিশা।
হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে অয়ন। আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে মায়ের হাত ধরে বেরিয়ে যায় দিশা — অয়নের ঘরনি, ভীত-সন্ত্রস্ত দিশা নয়, ব্যক্তিত্বময়ী পুনর্জন্ম পাওয়া নারী দিশারী সেন।
তারপর কেটে গেছে আরও চার বছর। দিশার এখন তিনজনের সুখী সংসার — সে, তার মা রীনা দেবী এবং তার একমাত্র কন্যা কথাকলি। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে দিশা যে প্রতিজ্ঞা করেছিল, তা সে রেখেছে। সে আবার এইচ. আর পদে চাকরিতে যোগদান করেছে। তৈরি করেছে নিজের পরিচিতি, মেয়েকেও মানুষ করছে নিজের পরিচয়ে। দিশার ভাষায়, "মৃত্যুর পর" নতুন জন্মে সে আর মানসিক অবসাদগ্রস্ত নয়। হাজার দুঃখের মধ্যেও সে খুব সুখী, খুব খুশি, অটুট রয়েছে তার আত্মসম্মান। এইভাবেই দিশা এগিয়ে চলেছে নতুন জীবনে আলোর দিশারী হয়ে।
আপনার ভোটেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
বিস্তারিত নিয়ম
প্রতিটি কলম প্রতিক্রিয়াই একবার করে দেওয়া যাবে, তবে প্রয়োজনে সেই প্রতিক্রিয়া পরিবর্তন করা সম্ভব। কোনো লেখায় একটি কলম প্রতিক্রিয়া দেওয়ার পর, একই মাসে অন্য কোনো লেখায় সেই একই কলম প্রতিক্রিয়া নির্বাচন করলে আগের প্রতিক্রিয়াটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে, রয়ে যাবে সর্বশেষ প্রতিক্রিয়াটি। এই প্রতিক্রিয়াগুলির মাধ্যমেই নির্বাচিত হবেন ‘মাসের সেরা কলম’ সম্মানের ‘পাঠকের প্রতিক্রিয়া’ পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক–লেখিকারা।