Go to Bangali.Network
Go to Bangali.Network



লেখা পাঠান


আমাদের কথা
Contests

উদ্যোগ
Web Magazine


উদ্যোগ Web Magazine
Glocal বাঙালি | Vocal বাঙালি
Glocal বাঙালি | Vocal বাঙালি
অ-শরীরী — প্রথম পর্ব
অ-শরীরী — প্রথম পর্ব

প্রথম পর্ব


আশির দশকের শেষের দিক। গ্রাজুয়েশনের পাঠ শেষ করে পরের বুটের গোঁতা খেয়ে জীবিকা নির্বাহের চেষ্টা করছি। সেই সময়ে আমার আর্থিক সম্বল বলতে ছিল টিউশনি। উপার্জন খুব মন্দ কিছু হতো না, কিন্তু মধ্যবিত্ত ঘরে যা হয়, একটা মাসিক স্থির আয়ের বন্দোবস্ত করার জন্য এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জে ধর্না দেওয়া, পি. এস. সি., রেল — এসব জায়গায় প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা দেওয়া, এইসব চলছিল। আমার বাবা, আমার চাকরিবাকরির প্রতি খুব একটা আশান্বিত ছিলেন না, কারণ এমনিতেই আমার শিক্ষাগত যোগ্যতার মান খুব একটা ভালো ছিল না — কোনোরকমে টেনেটুনে বি. এস. সি. পাশ, তার ওপর সারাদিন ক্লাব, পার্টি (রাজনৈতিক), আর ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোতে আমি বেশি ব্যস্ত থাকতাম। কলেজ থেকে বেরিয়ে আসার পরও বেশ কিছু বন্ধুর সঙ্গে আমার যোগাযোগ ছিল সেই সময়। প্রায় প্রতিদিন সন্ধ্যায় হাতিবাগানের মিতালী রেস্টুরেন্টে আমাদের আড্ডা বসত।

তখন বর্ষাকাল। একদিন এইরকম এক আড্ডায় নিশীথ বলল, "আচ্ছা, তোরা কেউ ভূতে বিশ্বাস করিস?" অন্য সবাই হেসে উড়িয়ে দিলেও আমি বললাম, "দেখ, ভূতের আক্ষরিক অর্থ হল — যা হয়ে গেছে; বর্তমান হল — যা হচ্ছে, আর ভবিষ্যৎ হল — যা হবে। তাহলে বর্তমান যদি বিশ্বাস করি, তাহলে ভূত বিশ্বাস না করার কোনো কারণ নেই, কারণ আজ যা বর্তমান, কাল সেটাই ভূত।"

কথা শেষ হতে না হতেই সমর বলে উঠল, "এই — ব্যাস — শুরু হল স্বামী শ্রী শ্রী জ্ঞানদানন্দের বাণী।" আমি বললাম, "সে তোরা যাই বলিস, আমি দেখি বা না দেখি, জানি বা না জানি, ভূত, ভগবান, প্রেত, পিশাচ — এসবের অস্তিত্ব নিশ্চয়ই আছে। এই পৃথিবীতে বা পৃথিবীর বাইরেও এমন অনেক কিছু আছে, যা আমাদের সাধারণ বুদ্ধিবিবেচনার বাইরে। আমি প্রত্যেকটির অস্তিত্বেই বিশ্বাস করি, কিন্তু কোনো কুসংস্কার বা কাল্পনিকতায় বিশ্বাস করি না, আর ভয়ও পাই না।"

এইভাবে কথাবার্তা বেশ কিছুক্ষণ চলার পর প্রায় রাত ৯টার সময় আমরা যে যার বাড়ি ফিরে এলাম।

পরের দিন সকালবেলায় বাড়ির বাজার করে ফিরে চা নিয়ে একটু বসে খবরের কাগজ পড়ছি, হঠাৎ ফোন বেজে উঠল। উঠে গিয়ে ফোন ধরে দেখি নিশীথ ফোন করেছে। ফোনের ওপার থেকে নিশীথ বলল, "বাপি, তোর সঙ্গে আমার একটা জরুরি কথা আছে। কখন, কোথায় সময় হবে যদি বলিস, তাহলে খুব ভালো হয়।"

আমি স্বভাবতই অবাক হয়ে বললাম, "কেন? সময়ের কী আছে, সন্ধ্যাবেলা মিতালীতে আসছিস তো? সেখানেই কথা হবে।"
নিশীথ বলল, "না, ওখানে বলা যাবে না।"
আমি বললাম, "কেন?"
নিশীথ বলল, "আঃ, বলছি না বলা যাবে না, আর তাই যদি যেত তাহলে কি তোকে এখন আমি ফোন করতাম? অবশ্য তোর যদি কোনো অসুবিধা থাকে, তাহলে থাক।"
বলে নিশীথ ফোনটা রাখতে যাচ্ছিল। আমি তাড়াতাড়ি বলে উঠলাম, "ঠিক আছে, একটা কাজ কর, আজ দুপুরে, ওই দুটো নাগাদ কফি হাউসে চলে আয়। কথা হবে।"

আমার কথা শুনে নিশীথ যেন একটু হাঁফ ছেড়ে বলল, "বেশ, তাহলে আজ দুপুর দুটো, কফি হাউস। মনে থাকে যেন ভাই।"
আমি একটু হেসে বললাম, "হ্যাঁ রে বাবা, নিশ্চয়ই আসব।"

দুপুরে যথাসময়ে কফি হাউসে গিয়ে দেখি, নিশীথ আগে থেকেই এসে বসে আছে। আমি গিয়ে বসতেই সে দুটো ব্ল্যাক কফির অর্ডার দিল। তারপর পকেট থেকে একটা গোল্ড ফ্লেকের প্যাকেট বার করে, তার থেকে নিজে একটা সিগারেট বার করে আমার দিকে প্যাকেটটা এগিয়ে দিল। আয়েশ করে সিগারেট ধরিয়ে নিশীথ একটা লম্বা ধোঁয়ার রিং ছেড়ে আমার দিকে একটু তাকিয়ে থেকে বলল, "কি? খুব অবাক হয়ে গেছিস না?"

আমি বললাম, "হ্যাঁ, তা একটু হয়েছি বটে। যাই হোক, বল তোর কথা, কী বলতে চাস?"

ইতিমধ্যে কফি হাউসের ওয়েটার দুটো ব্ল্যাক কফি নামিয়ে দিয়ে গেল।

নিশীথ কফিতে একটা চুমুক দিয়ে বলল, "বাপি, তুই তো জানিস, আমাদের ফ্যামিলি মাইনগরের বোসেদের। এককালে অনেক আর্থিক এবং সামাজিক প্রতিপত্তি ছিল আমাদের, কিন্তু এখন না আছে রাজা, না আছে রাজত্ব। শুনতেই তালপুকুর, ঘটি ডোবে না। আমার ঠাকুরদা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় অনেক সস্তায় একটা একতলা বাগানবাড়ি কিনেছিলেন, শিমুলতলার লাট্টু পাহাড়ের কাছে গ্রাম থেকে একটু দূরে এক নির্জন জায়গায়। ঠাকুরদা সম্ভবত সারা বছরের পরিশ্রমের পর একটু অবসর-বিনোদন বা হাওয়াবদলের জন্য বাড়িটা কিনেছিলেন।

আমি ছোটবেলায় এক-দুবার গেছি ওই বাড়িতে, কিন্তু পরে নানান কাজে আর যাওয়া হয়ে ওঠেনি। খুব মনোরম পরিবেশ। চারদিকে বনের সবুজ গাছপালা, বাড়ির সামনে অনেকটা জায়গা ঘিরে বিভিন্ন ফুলগাছ, আর পিছনে আম, জাম, কাঁঠাল, ডাব — এইসব গাছ, আর একটা নাতিদীর্ঘ পুকুর। সেকালে অনেক বাঙালিরই শিমুলতলায় বাড়ি ছিল, বায়ু পরিবর্তনের জন্য। বাবা পরবর্তীকালে বাড়িটাতে একটা কেয়ারটেকার রেখেছিলেন। কোনো টুরিস্ট এলে তাঁদের ওই বাড়ি ভাড়া দেওয়ার বন্দোবস্ত ছিল। এতে দুপয়সা যেমন আসত, তেমনি ওই বাড়ির মেরামত বা রক্ষণাবেক্ষণের জন্য আলাদা করে কোনো খরচ হতো না, মোটামুটি ভাড়ার টাকাতেই হয়ে গিয়েও কিছু টাকা ঘরে আসত।

বছর তিনেক আগে এক বাঙালি টুরিস্ট — স্বামী, স্ত্রী ও মেয়ের পরিবার — কিছু দিনের জন্য ওই বাড়িটা ভাড়া নেয়। তখন এইরকম বর্ষাকাল ছিল। যেদিন ওরা আসে, সেই দিন রাতে প্রচণ্ড ঝড়বৃষ্টি শুরু হয়, সঙ্গে মুহুর্মুহু বজ্রপাত। লোকমুখে শোনা, সেই দিন মাঝরাতে এক বিরাট বজ্রপাত হয় ওই বাড়ির ওপর, আর তাতে বাড়িতে থাকা ওই টুরিস্ট পরিবার ও কেয়ারটেকার সকলেই মারা যায়। বাড়িটাও খুব ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

পরের দিন যথাসময়ে পুলিশ আসে দেহ নিয়ে গিয়ে ময়নাতদন্ত করবে বলে, কিন্তু তারা বাড়িতে তিনটি বাজে ঝলসানো মৃতদেহ পায় — একটি নারীর ও দুটি পুরুষের। আশ্চর্যজনকভাবে আর একটি নারীর কোনো দেহাংশ পাওয়া যায়নি। যাই হোক, তারপর বাবা আস্তে আস্তে বাড়িটার সংস্কার করেন, কিন্তু এবার আর কোনো কেয়ারটেকার রাখেননি। তার একটা কারণ, সেই আগের কেয়ারটেকারের মৃত্যুর পর তার পরিবারের সঙ্গে ক্ষতিপূরণ নিয়ে অনেক বাদানুবাদ হয়েছিল, আর তা ছাড়া ওই ঘটনার পর কেউ রাজিও ছিল না ওই বাড়িতে থাকতে।

ক্রমে বাড়িটার একটা বদনাম হতে শুরু করল। স্থানীয় লোকেরা বলতে লাগল, ওই বাড়িতে নাকি ভূত আছে। চোখে কাউকে দেখা যায় না বটে, কিন্তু তার উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। যেমন, বাড়ির লাগোয়া পুকুরে পায়ের ছাপ, ফলমূল যা হতো বাগানে কেউ যেন পেড়ে নিত, বাড়ির সামনের অংশ প্রায়ই এমন পরিষ্কার থাকত, যেন কেউ নিয়মমতো ঝাঁট দিয়ে রেখেছে — এইসব আর কী। ফলে এখন কোনো টুরিস্টই আর আসে না ওখানে। আর জানিস তো, বাবা আর কদিন বাদেই রিটায়ার করবেন, তখন এই বাড়ির ভাড়া আমাদের একটা অত্যন্ত জরুরি সম্বল হয়ে উঠবে।"

নিশীথ একটু থামতেই আমি বললাম, "সে তো বুঝলাম, কিন্তু এই ক্ষেত্রে আমি কী করতে পারি?"

নিশীথ বলল, "বাপি, তুই তো ছোটবেলা থেকেই ডাঁটাবুকো জানি। আর আমার ভালো মনে আছে, সেই সঞ্জীবদের গ্রামের বাড়ির দুর্গাপুজোয় গিয়ে বাজি ধরে এক রাত ওদের ওখানকার শ্মশানে রাত কাটিয়েছিলি। তাই আমার একটা অনুরোধ, তুই যদি দিন কয়েক আমাদের ওই বাড়িটাতে গিয়ে থাকিস, তাহলে অন্তত স্থানীয় লোকেদের কুসংস্কারটা দূর হয় আর বাড়ির বদনামটাও ঘোচে। আর সেটা হলে আমাদের অর্থনৈতিক সুরাহাও হয়। এখন তুই যদি রাজি থাকিস, তাহলে আমি ট্রেনের টিকিট, ও ওখানকার থাকা-খাওয়ার সব বন্দোবস্ত করে দেব। প্লিজ ভাই।"

আমি ওর দিকে তাকিয়ে একটু মুচকি হেসে বললাম, "তা, এত লোক থাকতে আমাকেই বলির পাঁঠা স্থির করা হল কেন?"

আমার এই কথা শুনেই সঙ্গে সঙ্গে নিশীথ উঠে দাঁড়িয়ে আমার হাত দুটো ধরে বলল, "একদম এসব মনে করিস না, বাপি। তোর সঙ্গে কি আমার সেই সম্পর্ক? তুই ও আমি, আমরা এক পরিবারভুক্ত বলেই জানি ও মানি। তবে তোর যদি মনের কোণে কোথাও এতটুকু সন্দেহ থাকে, তাহলে থাক, তোকে যেতে হবে না, কারণ আমাদেরকে এই সহযোগিতা করার জন্য তোর মতো বন্ধু আমি হারাতে পারব না।"

আমি সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলাম, "ধুর পাগল! আমি মজা করছিলাম। দেখ, যেতে আমার কোনো আপত্তি নেই, কারণ আমি যতদূর জানি, যদি কেউ থেকেও থাকে সেখানে, তাঁদের আমি যদি অসুবিধা সৃষ্টি না করি, তাহলে তারাও বোধহয় আমার কোনো অসুবিধা সৃষ্টি করবে না। যাই হোক, আমি যেতে রাজি। কিন্তু একটু সময় দে ভাই, বুঝিসই তো বাড়িতে মা ম্যানেজ হয়ে যাবে, কিন্তু বাবাকে ম্যানেজ করাটাই হল আসল কাজ। দেখি একটু চিন্তা করে, কীভাবে ফন্দিফিকির করে বাবার মত আদায় করা যায়।"

এই বলে সেই দিনের মতো আমরা কফি হাউস থেকে বেরিয়ে এলাম। বাড়ি ফিরে এসে ভাবতে লাগলাম, কী বলে বাবাকে রাজি করানো যায়।

সন্ধ্যাবেলায় বাবা অফিস থেকে ফিরে খেয়ে-দেয়ে ঘরে বসে বিশ্রাম নিচ্ছেন, তখন আমি বাবাকে গিয়ে বললাম, "বাবা, আমাদের কলেজের কয়েকজন বন্ধু মিলে শিমুলতলা বেড়াতে যাবে বলে প্ল্যান করছে। আমাকেও যেতে বলছিল। আমার যদিও খুব একটা ইচ্ছে নেই, কিন্তু বারবার এমন করে বলতে লাগল যে তখন আমি ওদের বললাম, দেখ, আমার বাড়ি তো তোদের মতো নয়, যখন যা ইচ্ছে করব, বাড়ির একটা নিয়মকানুন আছে, অমন বললেই যাওয়া যায় না। দেখি বাড়িতে বাবা-মার সঙ্গে কথা বলে, যদি ওনারা রাজি হন তবেই যাওয়া, নচেৎ নয়।"

বাবা আমার দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে উঠে সোজা হয়ে বসে বললেন, "ক্লাব, রাজনীতি — এসব করে কথা তো ভালোই ফেলতে শিখেছিস। তা প্রোগ্রাম কত দিনের?"
আমি বললাম, "ওই দু-তিন দিনের।"
বাবা বললেন, "দু দিন না তিন দিন?"
আমি বললাম, "তিন দিনেরই হবে।"
বাবা বললেন, "তা, এত জায়গা থাকতে হঠাৎ শিমুলতলা কেন?"
আমি বললাম, "আসলে, নিশীথদের একটা বাড়ি আছে শিমুলতলায়, সেখানে আমরা কদিন থাকব, নিজেরাই রান্নাবান্না করে খাওয়াদাওয়া করব আর কাছে-পিঠে যে সব পাহাড়, নদী, মন্দির আছে সেগুলো দেখব, এই আর কী।"
বাবা অবাক স্বরে বললেন, "রান্নাবান্না! তুই তো চা ছাড়া কিছু করতেই পারিস না, তুই করবি রান্নাবান্না?"
আমি সঙ্গে সঙ্গে বললাম, "না, আমি ওই ওদের হাতে হাতে করে দেব, বাজার করে দেব, এইসব আর কী।"

বাবা এবার কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন, "বেশ যা, কিন্তু একটা কথা, ওই পাঁচজনের হুল্লোড়ে যেন নিজেকে ভাসিয়ে দিস না। আর একটা কথা, তুই পেটরোগা ছেলে, যতই লায়েক হয়ে যাস, সঙ্গে ওষুধ নিতে ভুলিস না। শিমুলতলার পরিবেশ এমনিতে ভালো, তবে ঠান্ডা ভাব এখনও ওখানে, তাই গায়ের গরম চাদর নিয়ে যাস।"
আমি বললাম, "হ্যাঁ, সে সব নিয়ে যাব। মা-কে বললেই মা সব ঠিক গুছিয়ে দেবে। ও নিয়ে আমার কোনো টেনশন নেই।"

বাবার ঘর থেকে বেরিয়ে একটা হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। যাক, বাবা রাজি হয়েছেন। হাইকোর্টের রায় হয়ে গেছে, এখন আর লোয়ার কোর্ট তেমন কিছু করতে পারবে না।

পরে ফোন করে নিশীথকে সব জানাতে, নিশীথ বলল, সে টিকিটের ব্যবস্থা করেই আমায় জানাবে।

এর দিন দুই পর নিশীথ ফোন করে জানাল যে আগামী শুক্রবার রাত ৯টা ৪৫-এর বাঘ এক্সপ্রেসে যাওয়ার টিকিট, ও ফেরার টিকিট সোমবার বিকেল ৪টের মোকামা ফাস্ট প্যাসেঞ্জার ট্রেনের। আমি যেন শুক্রবার রাত ৯টার মধ্যে হাওড়ার বড় ঘড়ির সামনে দাঁড়াই।

হাতে মাত্র একদিন। মা-কে বললাম সব কথা। মা সেইমতো একটা কিট ব্যাগ আমার জন্য গুছিয়ে দিলেন। শুক্রবার বাড়ি থেকে হাওড়ার উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার সময়, মা কিট ব্যাগের সঙ্গে হাতে একটা ঢাউস টিফিন ক্যারিয়ার ধরিয়ে দিলেন। তাতে তিনজনের জন্য লুচি, আলুরদম আর মিষ্টি দেওয়া আছে। আসলে বাড়িতে জানে, আমি একা নই, সঙ্গে আরও দুজন যাচ্ছে। যাই হোক, আমি আর কোনো কথা না বলে মা, বাবা-কে প্রণাম করে বেরিয়ে পড়লাম বাগবাজার লঞ্চঘাটের দিকে। পিছন থেকে শুনতে পেলাম মা, "দুগ্গা, দুগ্গা" বলছেন।

যথাসময়ে হাওড়ার বড় ঘড়ির কাছে পৌঁছাতেই দেখি নিশীথ অনেক আগেই সেখানে উপস্থিত হয়ে রয়েছে।

নিশীথ আমায় ট্রেনের টিকিট দুটো হাতে দিয়ে বলল, "স্টেশন থেকে বেরিয়েই অটোস্ট্যান্ড, সেখানে রাজেশ বলে একটি ছেলে থাকবে, ওর নিজের অটো, ওই তোকে আমাদের বাড়ি পৌঁছে দেবে। আর এত দিন বাড়িটা বন্ধ, সেইজন্য বাড়ি সাফসুতরো করার জন্য একটা লোক আর রান্নাবান্না করার জন্য একটা লোক ও-ই ঠিক করে দেবে।"

আমি ট্রেনে উঠে নিজের সিট খুঁজে, কিট ব্যাগটা রেখে বসতেই, নিশীথ আমার পাশে বসে আমার হাত দুটো ধরে বলল, "বাপি, তোকে ধন্যবাদ জানানোর আমার কোনো ভাষা নেই। আমি পোস্টঅফিসের মাস্টারমশাইকে বলে রেখেছি তোর কথা, রাজেশ রোজ তোর খবর নিয়ে আমায় পোস্টঅফিস থেকে ফোন করবে। আর একটা কথা, যদি সেরকম কিছু অসুবিধা বুঝিস, কোনো দ্বিধা না করে ফেরত চলে আসিস ভাই। আর হ্যাঁ, এই নে বাড়ির চাবি, একদম ভুলেই যাচ্ছিলাম দিতে। আর এই টাকাটা রাখ, যদি আগেই ফিরে আসতে হয়।"

বলে সে আমার দিকে একটা চাবির থোকা আর ২০০ টাকা আমার দিকে এগিয়ে দিল।

আমি শুধু চাবির থোকাটা নিয়ে বললাম, "না রে। টাকা আমার লাগবে না। যদি আগে ফিরতে হয়, তার জন্য আমার কাছে টাকা আছে। সে সব পরে দেখা যাবে। আমার-তোর মধ্যে কি সেই সম্পর্ক? তবে বাড়ি থেকে যদি কোনো খোঁজখবর করে, একটু বুদ্ধি করে ম্যানেজ করিস ভাই, কারণ আমাদের বাড়িতে একমাত্র তোদের বাড়িরই নম্বর আছে, সুতরাং এই কদিন ভুলেও তুই ফোন ধরিস না যেন, আর বাড়িতেও ব্যাপারটা বুঝিয়ে দিস, কারণ আমার বাড়িতে জানে আমরা তিন বন্ধু শিমুলতলা বেড়াতে যাচ্ছি। আমিও সুযোগ-সুবিধা পেলে পোস্টঅফিস থেকে বাড়িতে আর তোকে ফোন করব।"

এমন সময় ট্রেন ছাড়ার হুইসেল দিতে নিশীথ নেমে গেল, বলল, "সাবধানে আসিস ভাই।"

ট্রেন ধীরে ধীরে স্টেশন ছেড়ে এগোতে লাগল। ধীরে ধীরে ট্রেনের স্পিড বাড়ল, বাইরের অন্ধকারের বুক চিরে ট্রেন এগোতে লাগল। রাত ১০টা নাগাদ আমি টিফিন ক্যারিয়ার খুলে কটা লুচি, আলুরদম ও মিষ্টি খেয়ে বাকিটা টিফিন ক্যারিয়ারবন্দি করে রেখে দিলাম। এরপর আমি যুত করে কিট ব্যাগটা মাথায় দিয়ে শুয়ে পড়লাম। কিন্তু রাত ৩টা ৩০ মিনিটে ট্রেন শিমুলতলা পৌঁছাবে, তাই সেই টেনশনে ঘুম আসছিল না, বারে বারে ঘড়ি দেখছিলাম। কখন একটু চোখ লেগে গিয়েছিল জানি না, চোখ খুলে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি ৪টে বাজে। আমি হুড়মুড় করে উঠে বসে দেখি, পায়ের কাছে একজন ঘাড় নিচু করে বসে আছে। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, "দাদা, শিমুলতলা কি ছেড়ে গেছে?" ভদ্রলোক মুখ তুলে একটু হেসে বললেন, "না, ট্রেন লেট চলছে, এবার সামনে আসবে শিমুলতলা।"

আমি ব্যাগ নিয়ে গেটের কাছে দাঁড়িয়ে রইলাম। প্রায় সোয়া চারটে নাগাদ ট্রেন শিমুলতলায় দাঁড়াল। আমিও প্ল্যাটফর্মে নেমে গেলাম। নেমে দেখি আধো-অন্ধকার ও কুয়াশায় চারদিক ঘিরে রয়েছে। একটু ঠান্ডা ঠান্ডাও লাগছে। স্টেশন থেকে বেরিয়ে দেখি একটা মাত্র অটো দাঁড়িয়ে আছে, আর তার সামনে একটা লোক মাথা নিচু করে হাতে খৈনি ডলছে। আমি এদিক-ওদিক আর কাউকে দেখতে না পেয়ে, ওই লোকটিকে জিজ্ঞাসা করলাম, "ভাইসাব, ইহাঁ রাজেশ নামকা কোই অটোওয়ালা হ্যায় ক্যা?"

লোকটি একটু টানা বাংলায় বলল, "জি সাব, আমিই রাজেশ আছি। আপনি ছোড়দা, মতলব, নিশীথ বাবুর কাছ থেকে আসছেন তো? আপনি বাপি বাবু আছেন?"

আমি বললাম, "ও, তুমিই রাজেশ! বেশ। হ্যাঁ, আমিই বাপি। আমি নিশীথদের বাড়ি যাব বলে এসেছি, নিশীথ আমার অনেক দিনের কলেজের বন্ধু।"

রাজেশ আমার হাত থেকে কিট ব্যাগ আর টিফিন ক্যারিয়ারটা নিয়ে অটোর পিছনের সিটের পিছন দিকে ঠিক করে রেখে দিল। তারপর হাতে থাকা খৈনি ঠোঁটের নিচে ফেলে বলল, "চলুন বাবুজি, আরাম করে পিছনে বসে যান।" দেখলাম অটোস্ট্যান্ডের বাঁ দিকে একটা চায়ের দোকান, সেখানে কয়েকজন দেহাতি বসে চা খাচ্ছে। আমি বললাম, "রাজেশ ভাই, একটু চা খেয়ে গেলে মন্দ হতো না।"
রাজেশ বলল, "কুনো ব্যাপার নেই সাব, আমি এখুনি মুখে খৈনি ডেলেছি, আপনি খেয়ে নিন।"

আমি তখন ওই চায়ের দোকানে গিয়ে গরম ধোঁয়া ওঠা মোটা দুধের চা খেয়ে, পকেট থেকে একটা সিগারেট বার করে ধরিয়ে অটোয় এসে উঠে বসলাম।

অটো স্টার্ট দিয়ে যেতে যেতে রাজেশ বলল, "বাবুজি, আপনি কদিন থাকবেন?"
আমি বললাম, "দু দিন।"
রাজেশ বলল, "বাড়ি সাফ করার জন্য একটা আদমি আমি যাওয়ার পথে উঠিয়ে নেব, তারপর ছোড়দার বাড়িতে আপনাদের নামিয়ে বাজারে আসব। একটু কেরোসিন, বাজার — এ সব লিয়ে, আর সঙ্গে রান্নার লোক ভি লিয়ে ফির আসবো। কিঁউ কি, এত সকালে তো বাজারে কুছু পাওয়া যাবে না, বাবুজি।"
আমি বললাম, "হ্যাঁ, আমার কোনো তাড়া নেই। তুমি ধীরে সুস্থে সব করো।"

পথিমধ্যে রাজেশ একটি মাঝবয়সি ছেলেকে অটো তে তুলে নিল। নাম রাজকুমার। জানলাম এই ছেলেটিই নিশীথ দের বাড়িটা পরিস্কার করে দেবে। ক্রমে মাল্ভুমি ছেড়ে অটো গ্রামের কাঁচা পাকা রাস্তা ধরল , পথিমধ্যে একটা শিব মন্দির দেখলাম, এরপর লাট্টু পাহাড় এর কোল ঘেঁষে একটু নির্জন জায়গায় একটা একতলা বাড়ীর সামনে অটো থামল। বাড়িটার প্রায় তিন দিকেই গাছপালার জঙ্গল, পিছন দিকে একটা পাড় বাঁধানো ছোট পুকুর আর বাগান আর সামনের দিকে অনেকটা জায়গা ঘিরে অনেক ফুলের গাছ রয়েছে।

অটো থেকে নেমে বাড়ীর দিকে যেতে লক্ষ্য করলাম বাড়ীর সামনের জায়গাটা বেশ সাফ সুতরো করে রাখা আছে যেন কেউ একটু আগে ঝাঁট দিয়ে পরিস্কার করে রেখেছে। আমি বাড়ীর চাবি বার করে দরজার তালা খুলতে চেষ্টা করতে লাগলাম। কিন্ত অনেকদিন না খোলার দরুন চাবি পুরো ঘুরছিল না। তালার ওই অবস্থা দেখে রাজেশ তার অটো থেকে একটু পোড়া মবিল নিয়ে এসে তালার চাবির গর্তে দিয়ে দিল। কিছুক্ষণ বাদে একটু চাবি এদিক ওদিক ঘোরাতেই তালা খুলে গেল। দরজার হুড়কো টা বেশ জ্যাম ছিল, অনেক কষ্টে সেটি খুলে বাড়ীর ভিতর পা রাখতেই আমি বেশ অবাক হলাম।

প্রথম পর্ব উপভোগ করেছেন? দ্বিতীয় পর্ব প্রকাশিত হবে এপ্রিল সংখ্যায়।




আপনার ভোটেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’

এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন

বিস্তারিত নিয়ম

প্রতিটি কলম প্রতিক্রিয়াই একবার করে দেওয়া যাবে, তবে প্রয়োজনে সেই প্রতিক্রিয়া পরিবর্তন করা সম্ভব। কোনো লেখায় একটি কলম প্রতিক্রিয়া দেওয়ার পর, একই মাসে অন্য কোনো লেখায় সেই একই কলম প্রতিক্রিয়া নির্বাচন করলে আগের প্রতিক্রিয়াটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে, রয়ে যাবে সর্বশেষ প্রতিক্রিয়াটি। এই প্রতিক্রিয়াগুলির মাধ্যমেই নির্বাচিত হবেন ‘মাসের সেরা কলম’ সম্মানের ‘পাঠকের প্রতিক্রিয়া’ পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক–লেখিকারা।

আপনি কি লিখতে ভালোবাসেন?

‘উদ্যোগ’ ওয়েব ম্যাগাজিনের এপ্রিল সংখ্যা ❛নববর্ষ ১৪৩৩❜ প্রকাশিত হবে ১৫ এপ্রিল। ওয়েবসাইটে ঘোষিত বিভাগগুলি থেকে আপনার পছন্দের বিষয়ে লেখা পাঠান ১০ই এপ্রিলের মধ্যে। লেখা পাঠানোর আগে অতি অবশ্যই শর্তাবলী পড়ুন। নির্বাচিত লেখাগুলি লেখক / লেখিকার ছবি ও সংক্ষিপ্ত পরিচিতিসহ Bangali.Network ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হবে, এবং ১২ জন পর্যন্ত লেখক / লেখিকা পাবেন 'মাসের সেরা কলম' সম্মান। বিশদে জানতে ও আপনার লেখা পাঠাতে এখানে ক্লিক করুন

পৃষ্ঠা

ডিসক্লেইমার : লেখা, মতামত, মন্তব্য বা সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত সকল বক্তব্য সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা / সাক্ষাৎকারদাতার নিজস্ব এবং সম্পূর্ণ দায়ভার তাঁদের উপরই বর্তায়। এই সমস্ত মতামত Bangali Network-এর নিজস্ব মতামত, অবস্থান বা নীতির প্রতিফলন নাও হতে পারে। লেখক পরিচিতিতে প্রদত্ত তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজস্ব বিবরণ অনুযায়ী প্রকাশিত। Bangali Network উক্ত তথ্যের যথার্থতা, সম্পূর্ণতা বা নির্ভুলতা সম্পর্কে কোনো প্রকার নিশ্চয়তা প্রদান করে না এবং এ সংক্রান্ত কোনো দায় গ্রহণ করে না।

ডিসক্লেইমার : লেখা, মতামত, মন্তব্য বা সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত সকল বক্তব্য সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা / সাক্ষাৎকারদাতার নিজস্ব এবং সম্পূর্ণ দায়ভার তাঁদের উপরই বর্তায়। এই সমস্ত মতামত Bangali Network-এর নিজস্ব মতামত, অবস্থান বা নীতির প্রতিফলন নাও হতে পারে। লেখক পরিচিতিতে প্রদত্ত তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজস্ব বিবরণ অনুযায়ী প্রকাশিত। Bangali Network উক্ত তথ্যের যথার্থতা, সম্পূর্ণতা বা নির্ভুলতা সম্পর্কে কোনো প্রকার নিশ্চয়তা প্রদান করে না এবং এ সংক্রান্ত কোনো দায় গ্রহণ করে না।

ভালো লাগলে ভালোবাসা দিন
অপছন্দ হলে পরামর্শ দিন
মতামত জানাতে মন্তব্য করুন
0 0 ভোট
স্টার
guest
0 কমেন্ট
নতুন থেকে পুরোনো
পুরোনো থেকে নতুন ভোটসংখ্যা অনুসারে
ইনলাইন প্রতিক্রিয়া
সকল কমেন্ট দেখুন
ফেসবুক পেজ
Udyog Web Magazine by Bangali Network

বিভিন্ন বিষয় থেকে বেছে নিয়ে লেখা পড়ুন

    বিভিন্ন সংখ্যায় প্রকাশিত হওয়া লেখা পড়ুন

    মাসিক সংখ্যাগুলি দেখুন
    Scroll to Top