ক’দিন আগেই আমরা শিশুদের অঙ্কন প্রতিযোগিতা
আমার আঁকা বাবা-মা-এর ফল প্রকাশ করলাম — ১৪ নভেম্বর, শিশু দিবসে। ছোট ছোট হাতের আঁকা ছবি, রঙ, কল্পনা... সব মিলিয়ে একটাই বার্তা — শৈশবের পৃথিবী নিরাপদ, আলোময়।
কিন্তু ঠিক এক সপ্তাহও পেরোয়নি, তার মধ্যেই দিল্লির এমন একটা খবর সামনে এল যা ভেবে গা শিউরে ওঠে। যে স্কুলে গিয়ে নিরাপত্তা, সহায়তা, দিকনির্দেশনা পাওয়ার কথা — সেই স্কুলেই ১৬ বছরের এক কিশোর নিজেকে এতটাই কোণঠাসা, এতটাই অসহায় মনে করল, যে পৃথিবীকে নিজের বাসযোগ্যই মনে করলো না আর।
যে প্রতিষ্ঠান ভবিষ্যৎ গড়ার দায় নিয়েছিল, সেই প্রতিষ্ঠানই তার ভবিষ্যৎটাকে শেষ করে দিল।
আর সত্যিটা আরও অস্বস্তিকর — স্কুলটা নামী বলে, অভিভাবকেরা প্রভাবশালী বলে, খবরটা আলো পেল। কিন্তু একটু খুঁজে দেখলেই জানা যায় এটা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। শুধু গত এক সপ্তাহেই মহারাষ্ট্র, রাজস্থান, হায়দরাবাদ, কেরালাসহ আরও কয়েকটি রাজ্যে একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে।
জায়গা আলাদা, ছাত্র আলাদা, পরিবার আলাদা — কিন্তু পেছনের কাহিনি একই রকম —
▪️ কোথাও শাসন আর অপমানের সীমা গুলিয়ে ফেলা কোনও শিক্ষক,
▪️ কোথাও করিডরে বা ক্লাসরুমে নির্মম বুলি করা সহপাঠী,
▪️ আবার কোথাও নিজের বাড়ির মানুষদেরই ছুড়ে দেওয়া তুলনা আর তাচ্ছিল্যের নিঃশব্দ বিষ।
ওরা সংকেত দেয় — মন খারাপ, খাওয়া কমে যাওয়া, স্কুলে যেতে না চাওয়া, ঘুমের সমস্যা, হঠাৎ চুপচাপ হয়ে যাওয়া... কিন্তু আমরা — অভিভাবক, শিক্ষক, বড়রা — সেই সংকেতগুলোকে গুরুত্ব দিই না।
➖ পড়াশোনায় মন দে।
➖ নাটক করিস না।
➖ এ'টুকু ব্যাপারে প্যান প্যান করিস না।
➖ এটা কোনো major issue-ই নয়।
যে দেশে সবচেয়ে বেশি উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কথা বলা হয়, সেই দেশেই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সবচেয়ে কম আলোচনা হয়। আমাদের স্কুলগুলোয় শিক্ষকের প্রশিক্ষণে এখনো adolescent psychology আনুষ্ঠানিকভাবে জায়গা পায় না। আমাদের সমাজে depression এখনো আসল সমস্যা বলে বিচার হয় না। আমরা ছোটদের আবেগকে বিশেষ গুরুত্ব দি না। আমরা বুঝতে চাই না ওদের হঠাৎ পরিবর্তনগুলো নিরীহ mood swing নয় — বিপদের signal!
অথচ আজ যারা ভেঙে পড়ল, তাদের দরকার ছিল শুধু —
▪️ এমন একটা স্কুল, যেখানে ভয় দেখিয়ে শেখানো হয় না,
▪️ এমন একটি বাড়ি, যেখানে ভুল মানেই অপরাধ নয়,
▪️ এমন একজন শিক্ষক, যিনি তাচ্ছিল্য না করে বোঝান,
▪️ আর এমন অভিভাবক, যাঁরা মাঝপথে বাধা না দিয়ে শোনেন।
আমরা মানসিক স্বাস্থ্যের আলোচনা করি সাধারণত ঘটনা ঘটার পর — যখন দেরি হয়ে যায়। সময় এসেছে এই আলোচনা আগেই শুরু করার — রোজকার ছোট ছোট কথায়, আচরণে, নিয়মে, শিক্ষায়।
কারণ চোখ বন্ধ রাখলে আরও কত ভবিষ্যৎ অকালেই শেষ হয়ে যাবে — তার দায় থাকবে আমাদেরই।
প্রকাশিত হলো — বাঙালি.নেটওয়ার্ক-এর উদ্যোগ ই-পত্রিকার নভেম্বর ২০২৫ সংখ্যা। এই সংখ্যায় রইল স্বাস্থ্য, বিজ্ঞান, সাহিত্য, ইতিহাস, সমালোচনা, রিভিউ, জানা-অজানার নানা তথ্য ও ধারাবাহিক রচনার পাশাপাশি মন ও আত্মচেতনাকে কেন্দ্র করেও বেশ কিছু লেখা।
চলুন, একসাথে পড়ি, ভাবি, আর Glocal বাংলার জন্য Vocal হই।