কলকাতা টাউনহল কলকাতার গর্ব। সুদৃশ্য এই নগরহর্ম্য একদা ছিল বাংলার নবজাগরণ তথা বাংলার রাজনৈতিক ভাগ্য নির্ধারণের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। রোমান-ডোরিক স্টাইলের এই দোতলা ভবনটি লটারি করে তোলা সাত লক্ষ টাকায় ১৮০৭ থেকে ১৮১৩ সালের মধ্যে স্থপতি কর্ণেল জন গার্স্টিন (যাঁর নামে কলকাতার গার্স্টিন প্লেস) গড়ে তোলেন।
প্রথমদিকে একতলার হলঘরে রাখা অনেক মর্মর মূর্ত্তি এবং তৈলচিত্র সাধারণ নাগরিকদের দর্শনের জন্য খুলে রাখা হতো। কিন্তু দোতলায় গ্র্যান্ড হলে সম্ভ্রান্ত বাঙালী ও সাহেব মানুষজন সভা করার অনুমতি পেতেন। নবজাগরণের প্রায় সকল মনীষী যেমন রাজা রামমোহন রায়, প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর, শিক্ষক হেনরি ডিরোজিও, বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসু, রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রমুখদের পদধূলিতে ধন্য এই টাউনহল।
কলকাতা পৌর সংস্থা ও পশ্চিমবঙ্গ সরকার ১৯৯৫ সালে এই ঐতিহ্যমন্ডিত ভবনটির সংস্কার করে এখানে নগর সংগ্রহশালা তৈরি করতে প্রয়াসী হন। তখন রাজ্য সরকার ভেবেছিলেন কলকাতার তিনশো বছর উপলক্ষে কলকাতার ময়দানে যে প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছিল তার উপকরণ দিয়েই টাউনহলে সংগ্রহশালা গড়ে তোলা যাবে। ১৯৯৬ সালে কলকাতা পৌর সংস্থা, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাচীন ইতিহাস বিভাগের যে দুজন গবেষককে টাউনহলে মিউজিয়ামের উপযোগী উপকরণ বাছাই করা ও তালিকা লিপিবদ্ধ করার কাজে নিয়োগ করে, আমি তাদের মধ্যে একজন।
দায়িত্ব পেয়ে যেদিন কলকাতা টাউনহলে প্রথম গেলাম সেইদিন এক অদ্ভুত অনুভূতি হয়েছিল । ওখানকার নিরাপত্তারক্ষী আমাদের দোতলায় হলের লাগোয়া একটা বিশাল ঘর আমাদের বসার জন্য খুলে দিলেন, কিন্তু আমি না বসে নির্জন আলো-আঁধারি হলের মাঝে গিয়ে দাঁড়াই।
হঠাৎই একটা পায়রা কোথা থেকে উড়ে এসে মাথার ওপর ঝাপটা দিয়ে উড়ে চলে যায়! আমি কিছুক্ষণের জন্য হতচকিত হয়ে হলের মাঝেই বসে পড়েছিলাম। তখন স্টেজের দিকে চোখ পড়তে মনে হলো যেন একটা ছবি ভেসে উঠলো। ডিরোজিও বক্তব্য রাখছেন —
"Our condition is worse than savage degradation. Of what savage tribes has it yet been recorded that the parents have consigned the offspring to infamy?..."
নিজেই নিজের হাতে চিমটি কেটে বুঝলাম, ওই ভেসে ওঠা ছবি ইলিউশান মাত্র। আমি ফাঁকা হলের মাঝেই বসে আছি।
সত্যিই এই টাউনহলে ডিরোজিও ওই প্রতিবাদী বক্তব্য রেখেছিলেন ১৮৩১ সালে। আবার রাজা রামমোহন রায় এই টাউনহলে ১৮২৭ সালে স্ট্যাম্প অ্যাক্টের বিরুদ্ধে সভা করতে চেয়ে অনুমতি পাননি। অবশ্য তার আগে ১৮২৩ সালে উনি স্পেন-এর নতুন যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকারের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে একটি সান্ধ্যভোজের আয়োজন করেছিলেন এই টাউনহলে।
ভারতবন্ধু গভর্নর জেনারেল চার্লস মেটকাফের স্মৃতিতে সৌধ নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল এই টাউনহলেই ১৮৩৬ সালে। গড়ে উঠেছিল মেটকাফ হল। আবার ১৮৪০-এ ভারততত্ত্ববিদ জেমস প্রিন্সেপ-এর ভারতীয় বন্ধুরা এই টাউনহলে সমবেত হয়ে তাঁর স্মরণে গঙ্গাতীরে একটি ঘাট নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেন।
১৮৬৭ সালে কলকাতা টাউনহলের পরিচালনার দায়িত্বভার পৌর প্রতিষ্ঠানের ওপর ন্যস্ত হয়। এর কয়েক বছর পরে তৎকালীন সুপ্রিম কোর্ট, আজকের কলকাতা হাইকোর্ট নির্মাণকালে কিছুদিন টাউনহলে কোর্ট বসেছিল। ওই সময়কালে একদিন টাউনহলের সিঁড়িতে বিচারপতি প্যাক্সটন নরম্যানকে একজন ভারতীয় ছুরি মারেন। নরম্যান সাহেব সেইদিনই হাসপাতালে মারা যান।
আপনারা জানেন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৮৫ সালে। ১৮৮৬ সালে এর দ্বিতীয় অধিবেশন আয়োজিত হয়েছিল এই টাউনহলে। উপস্থিত ছিলেন উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো প্রখ্যাত বাগ্মী।
কলকাতা টাউনহল সাক্ষী আছে বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসুর সাড়া জাগানো গবেষণা ইলেক্ট্রো মাইক্রোওয়েভ-এর প্রথম প্রদর্শনীর জন্য। ১৮৯৫ সালে এক সন্ধ্যায় তৎকালীন লেফটেন্যান্ট গভর্নর উইলিয়াম ম্যাকেনজির সভাপতিত্বে এবং বহু গুণীজনের উপস্থিতিতে জগদীশচন্দ্র দেখান কীভাবে তড়িৎ তরঙ্গ ম্যাকেনজির শরীরকে মাধ্যম করে ঘরের দেয়াল ভেদ করে পাশের ঘরে রাখা একটা ঘন্টা বাজায় ও বারুদে বিস্ফোরণ ঘটায়।
পরবর্তী শতকের সূচনায় বাঙালীদের মধ্যে ব্রিটিশ বিরোধী মনোভাব দানা বাঁধতে থাকে। এরই মধ্যে গভর্নর জেনারেল কার্জন টাউনহলে সভা করে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল তৈরির সিদ্ধান্ত নেন এবং টাউনহলের একতলা থেকে বেছে বেছে ব্রিটিশদের মর্মর মূর্ত্তি ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল-এ পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন।
বিংশ শতকের প্রথম দশকে বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে কলকাতার টাউনহল এক গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। যখন থেকে ভাইসরয় কার্জন সাহেব বৈষম্যমূলক কার্যকলাপ শুরু করেছেন, তখন থেকেই কলকাতার নাগরিকবৃন্দ টাউনহলে সমবেত হয়ে প্রতিবাদে মুখর হয়ে উঠেছেন। ১৯০২-এ ইউনিভার্সিটিস্ কমিশনে সাদা চামড়ার দৌরাত্ম্য এবং কার্জনের বৈষম্যমূলক চিন্তাভাবনার প্রতিবাদে টাউনহলে সভা আয়োজিত হয়েছিল। এর ঠিক দু বছর পরে কার্জনের বঙ্গ ব্যবচ্ছেদ-এর প্রস্তাবকে কলকাতার শিক্ষিত মানুষজন বাঙালীদের একাত্মবোধ ভাঙার অভিসন্ধি বুঝে টাউনহলে প্রতিবাদী সভার আয়োজন করেন। সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে কলকাতার মানুষ দাবী তোলেন, বঙ্গ ব্যবচ্ছেদের পরিকল্পনা বাতিল করতে হবে। তবে এ ক্ষেত্রে ১৯০৫ এর ৭ ই অগাস্ট আহূত টাউনহল সভার রাজনৈতিক গুরুত্ব অপরিসীম।
১৯০৫ সালের ৭ ই অগাস্ট সারা কলকাতার অভিমুখ ছিল টাউনহল। শুধু তাই নয়, বাংলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকেও বহু মানুষ টাউনহলে সমবেত হন। সুরেন্দ্রনাথের আত্মজীবনী থেকে জানা যায়, সেইদিন টাউনহলের সভায় মানুষজন কলেজ স্কোয়ার থেকে সুবিশাল মিছিল করে গিয়েছিলেন। টাউনহলের ওপরের হলে, নিচের হলে আর দক্ষিণের মাঠে (এখন যেখানে বিধানসভা দাঁড়িয়ে আছে) মোট তিনটে সভা করা হয়েছিল। সুরেন্দ্রনাথের নেতৃত্বে বাংলার মানুষ সেইদিন ব্রিটিশ পণ্য বর্জনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন এই টাউনহলেই।
ওইদিন টাউনহলে ব্রিটিশ পণ্য বর্জনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছিল যখন, সেই সময়ে আন্দোলনের এক নেতা হালিম গজনভী সুরেন্দ্রনাথের কাছে গিয়ে বলেন যে, দোতলায় টাঙানো প্রতিবাদী কালো কাপড় খুলে ফেলার নির্দেশ দিতে। কারণ ওই কালো কাপড় ব্রিটিশ পণ্য। সঙ্গে সঙ্গে সব কালো কাপড় খুলে ফেলে দেওয়া হয়। এই ভাবে ব্রিটিশ পণ্য বর্জনের মধ্যে দিয়ে স্বদেশী আন্দোলনের সূচনা হলো ওই ১৯০৫ এর ৭ ই অগাস্ট।
স্বদেশী চিন্তাভাবনার প্রসার ঘটানোর জন্য বাংলার রাজনৈতিক নেতৃত্ব স্বদেশী শিক্ষার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। এই উদ্দেশ্যে বিপিনচন্দ্র পাল টাউনহলে বক্তৃতামালার আয়োজন করেন। ১৯০৫ এর ২৫ এ অগাস্ট রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর টাউনহলে বক্তৃতা করেন — 'অবস্থা ও ব্যবস্থা'।
কার্জন ১৯০৫ এর ১৬ ই অক্টোবর বঙ্গভঙ্গ কার্যকরী করেন। এর বিরুদ্ধে যে কোন সাধারণ প্রতিবাদ, বিশেষ করে ছাত্রদের প্রতিবাদ কড়া হাতে দমন করার চেষ্টা চলতে থাকে। 'বন্দে মাতরম্' শ্লোগান নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। এই পরিস্থিতিতে ১৯০৬ এর ১৪ ই অগাস্ট টাউনহলে আহূত এক বিশাল জনসভায় রবীন্দ্রনাথ, সুবোধ চন্দ্র মল্লিক, আব্দুল রসুল, ভূপেন্দ্রনাথ বসু, সামসুল হুদা, রাসবিহারী ঘোষ প্রমুখেরা জাতীয় শিক্ষা প্রসারের জন্য একটি পরিষদ গড়ে তোলার প্রয়োজন উপলব্ধি করেন। এইরূপ নিরন্তর প্রয়াসের ফলে তৈরি হয় জাতীয় শিক্ষা পরিষদ, যা পরিণত রূপ লাভ করে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে।
বেনারস হিন্দু ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছিল এই টাউনহলে ১৯১১ সালে মদনমোহন মালব্য, মনীন্দ্রচন্দ্র নন্দী, গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখদের উপস্থিতিতে। ওই ১৯১১ সালেই ব্রিটিশ সরকার বাধ্য হয়েছিল বঙ্গভঙ্গ রদ করতে।
পরের বছর ১৯১২ সালের ২৮ এ জানুয়ারি টাউনহলে রবীন্দ্রনাথের পঞ্চাশ বছর বয়স পূর্তিতে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ একটি অনুষ্ঠান করে। তবে কলকাতা পৌর সংস্থা ১৯৩১ সালের ২৭ এ ডিসেম্বর বিশ্বকবিকে নাগরিক সংবর্ধনা দেয় এই টাউনহলের দক্ষিণ প্রান্তে খোলা চত্বরে। প্রচুর মানুষ সমবেত হয়েছিল।
১৯২৪ সালে কলকাতা পৌর সংস্থা টাউনহলে গান্ধীজিকে নাগরিক সংবর্ধনা দেয়। গান্ধীজি তাঁর সংক্ষিপ্ত ভাষণে বলেন —
"In my humble opinion, it is the primary duty of a Corporation to ensure pure air, pure water, cheap and pure milk and fruits and free education for the children of its ratepayers and I wish that this Corporation will take the first step among the cities of India."
গান্ধীজির ওই উক্তিকে মান্যতা দিয়ে কলকাতা পৌর সংস্থা স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছে। তবে শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান স্বরূপ নগর-সংগ্রহশালা তৈরি করেছে অনেক পরে ২০০২ সালে। এই সংগ্রহশালা তৈরির কাজেই ১৯৯৬ সালে পৌর সংস্থা আমাকে নিয়োগ করে।
তখন আমি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাচীন ইতিহাস বিভাগের গবেষক। সেই গবেষণার কাজ ছেড়েই টাউনহলের কাজে যুক্ত হয়েছি। ১৯৯৯ সালে পৌর সংস্থা কলকাতা বিশেষজ্ঞ পরমেশ্বরণ থাঙ্কাপ্পান নায়ারের ব্যক্তিগত সংগ্রহ কিনে টাউনহলে গ্রন্থাগার তৈরি করলে আমার টাউনহলের সংগ্রহশালার প্রয়োজনে গবেষণার কাজ ত্বরান্বিত হয়।
সংগ্রহশালা বিশারদ ডঃ সরোজ ঘোষের তত্ত্বাবধানে এবং কলকাতা পৌর সংস্থার অর্থ সহায়তায় ২০০২ সালে যে অভিনব নগর সংগ্রহশালার দ্বারোদ্ঘাটন করেছিলেন কলকতার তৎকালীন মহানাগরিক সুব্রত মুখার্জী, তার প্রদর্শনী ২০১৭ সালে পৌর সংস্থা টাউনহলের সংস্কারের প্রয়োজনে বন্ধ করে দেয়।
সংস্কারের কাজ শেষ হয়েছে। নব কলেবরে আবার কলকাতা টাউনহলে নগর সংগ্রহশালা খোলার জন্য পৌর সংস্থা উদ্যোগী হয়েছে।