অস্বীকার করার উপায় নেই — ইংরেজি আজ বিশ্বভাষা। কিন্তু সেটা এই কারণে নয় যে ইংরেজি অন্য সব ভাষার চেয়ে 'উন্নত'। কোনো ভাষাই নিজে থেকে উন্নত বা অনুন্নত নয়। ভাষা শক্তিশালী হয় তখনই, যখন সেই ভাষাভাষী জাতি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে শক্তিশালী হয়।
ইংরেজির ইতিহাসই তার প্রমাণ। ১০৬৬ সালে নর্মান বিজয়ের পর ইংল্যান্ডের শাসকশ্রেণি দীর্ঘ সময় ফরাসি ব্যবহার করত; প্রশাসন ও আদালতের ভাষাও বহুদিন ফরাসি ও লাতিন ছিল। তবু ইংরেজি বিলুপ্ত হয়নি। ধীরে ধীরে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শক্তির কেন্দ্রে ইংরেজিভাষী জনগোষ্ঠী উঠে এলে ভাষাটিও মর্যাদা ফিরে পায় এবং পরে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিস্তারের সঙ্গে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। অর্থাৎ সাম্রাজ্য ভাষাকে বহন করেছে — ভাষা সাম্রাজ্য তৈরি করেনি।
ভারতীয় উপমহাদেশে ইংরেজির প্রসারও একইভাবে ক্ষমতার ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত। ঔপনিবেশিক শাসন, প্রশাসনিক কাঠামো, আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা ও পরে বিশ্বায়ন — এই ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার ফল হিসেবে ইংরেজি আমাদের জীবনে গভীরভাবে প্রবেশ করেছে। ইংরেজি শেখা তাই বাস্তবতার দাবি। কাজের জন্য, জ্ঞানের জন্য, বৈশ্বিক যোগাযোগের জন্য — ইংরেজি দরকার।
সমস্যা ইংরেজিতে নয়।
সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন নিজের মাতৃভাষা নিয়ে আমরা অবচেতনভাবে লজ্জা পাই। যখন আমরা ধরে নিই, ইংরেজি ভালো বলতে না পারা অশিক্ষার লক্ষণ — কিন্তু বাংলা ভালো বলতে না পারা নিয়ে তেমন অস্বস্তি অনুভব করি না। আরও বিস্ময়কর, অনেকে আজও বিশ্বাস করেন হিন্দি ভারতের 'রাষ্ট্রভাষা', যদিও ভারতের সংবিধানে এমন কোনো রাষ্ট্রভাষার ঘোষণা নেই; হিন্দি ও ইংরেজি কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক ভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হয়; আর শিক্ষানীতিতে 'ত্রিভাষা সূত্র' অনুসারে আঞ্চলিক ভাষা, হিন্দি বা অন্য ভারতীয় ভাষা ও ইংরেজি শেখানো হয়।
তরুণদের মধ্যে ভাষা-সংকোচ এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় — এটি একটি সামাজিক লক্ষণ। এর পেছনে শুধু 'গ্লোবালাইজেশন' বা আধুনিকতার অজুহাত নেই; আছে অর্থনৈতিক বাস্তবতা। আজ বাঙালি জাতি শিল্প, বাণিজ্য, প্রযুক্তি কিংবা মূলধনের নেতৃত্বে দৃশ্যমান শক্তি নয়। যে জাতি অর্থনৈতিকভাবে নেতৃত্ব দেয় না, সে জাতি সাংস্কৃতিক আত্মবিশ্বাসও ধরে রাখতে পারে না। ফলে অবচেতনে জাতিপরিচয় নিয়ে এক হীনমন্যতা জন্ম নেয়। আমরা নিজের ভাষাকে নয়, তার বাজারমূল্যকে মাপতে শুরু করি। আর যখন বাজারে তার দাম কম দেখি, তখন ভাষার যোগ্যতাকেও সন্দেহ করি। সেখান থেকেই আসে অন্য ভাষার প্রতি আত্মসমর্পণ — স্বেচ্ছায়, বিনা প্রতিরোধে।
কিন্তু এই সিদ্ধান্ত কি আদৌ উন্নতির সহায়ক হবে?
ভাষা কখনও সমস্যার কারণ নয়; ভাষা কেবল বাহন। আত্মবিশ্বাসের অভাব, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, নীতিগত ব্যর্থতা — এগুলোই প্রকৃত কারণ। জাপান, জার্মানি, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া — এরা কেউ নিজেদের উন্নয়নের ভিত্তি হিসেবে ইংরেজিকে বেছে নেয়নি। নিজেদের ভাষায় শিক্ষা, গবেষণা ও শিল্প গড়ে তুলেছে; প্রয়োজনের জায়গায় ইংরেজি শিখেছে, কিন্তু আত্মপরিচয় বদলানোর জন্য নয়।
আমি ব্যক্তিগতভাবে বহু বছর মুম্বাইয়ে কাটিয়েছি। পেশাগত ও সামাজিক পরিসরে আমার মারাঠি ও গুজরাটি পরিচিতই ছিল বাঙালির চেয়ে বেশি। সেই দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে — তারা নিজেদের মধ্যে ইংরেজি ব্যবহার করে নিজেদের শিক্ষিত প্রমাণ করার প্রয়োজন বোধ করে না। ব্যবসা, পরিবার, সামাজিকতা — স্বাভাবিক ভাষা তাদের নিজেরই। ইংরেজি সেখানে হাতিয়ার, পরিচয়ের প্রতিস্থাপন নয়। এটা কোনো পরিসংখ্যান নয়; ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ — দীর্ঘ সহাবস্থানের অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়া।
নিজের ভাষাকে ভালোবাসা মানে অন্য ভাষাকে ছোট করা নয়। কিন্তু নিজের ভাষা নিয়ে দৃঢ়তা না থাকলে বহুভাষিকতাও কেবল সামাজিক সাজসজ্জা হয়ে যায়। আমাদের ক্ষেত্রে অনেক সময়ই ভাষা হয়ে ওঠে সামাজিক সিঁড়ি। ইংরেজি উচ্চারণ, বাক্যগঠন, মিশ্র ভাষা — এগুলো দিয়ে সামাজিক অবস্থান মাপার এক অদৃশ্য সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। ফলে ভাষা হয়ে যায় প্রদর্শনের উপকরণ। আর যেটাকে প্রদর্শনের বস্তু বানাতে হয়, তার ওপর আত্মপরিচয়ের স্থায়ী ভিত গড়ে ওঠে না। যে আত্মপরিচয়ে অনিশ্চিত, সে যখন অন্যের পরিচয় অনুকরণ করে — তখন তার নিজস্ব কোনো পরিচয় আদৌ গড়ে ওঠে কি?
প্রকাশিত হলো — বাঙালি.নেটওয়ার্ক-এর 'উদ্যোগ' ওয়েব ম্যাগাজিনের ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সংখ্যা। নিবন্ধ, কবিতা, ধারাবাহিক রচনা, বিশেষ খবর এবং ছোট-বড় গল্পের পাশাপাশি এই সংখ্যার কেন্দ্রে রয়েছে একটি প্রশ্ন —
নিজের ভাষা নিয়ে সংকোচে ভুগে কোনো জাতি কি সত্যিই আত্মমর্যাদা অর্জন করতে পারে?
চলুন, একসাথে পড়ি, ভাবি, আর Glocal বাংলার জন্য Vocal হই।
প্রয়োজনীয় লেখা। বাঙালী বলতে সত্যিই একদিন লোকে বাংলাদেশী বুঝবে।